বাংলাদেশ, , বৃহস্পতিবার, ৫ আগস্ট ২০২১

মহামারীর এসময়ে ঈদের আনন্দ ছড়িয়ে দিতে সমাজের অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে

  প্রকাশ : ২০২১-০৫-১১ ১২:৫৯:৪৭  

পরিস্হিতি২৪ডটকম : কবি গোলাম মোস্তফা চমৎকারভাবে তার এক কবিতায় ঈদের বিষয়টি এভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন- ‘আজি সকল ধরা মাঝে বিরাট মানবতা মূর্তি লভিয়াছে হর্ষে, আজিকে প্রাণে প্রাণে যে ভাব জাগিয়েছে রাখিতে হবে সারা বর্ষে, এই ঈদ হোক আজি সফল ধন্য নিখিল-মানবের মিলন জন্য, শুভ যা জেগে থাক, অশুভ দূরে যাক খোদার শুভাশিস স্পর্শে।’ কেননা আমরা জানি, ঈদ মানে আনন্দ। ঈদ মানে খুশি। ঈদ মানে নতুন পোশাক। ঈদ মানে আপন মানুষের কাছে যাওয়া। ঈদ মানে স্বজন আর বন্ধুদের মিলনমেলা, হৈ-হুল্লোড়, ঘুরে বেড়ানো। কিন্তু এবার সেই অনাবিল আনন্দের আবহ নেই। খুশির জোয়ারও নেই। সবকিছু থমকে গেছে। গতবারের ঈদ ও কেটেছে এক ভয়ানক পরিস্হিতির মধ্যে দিয়ে ।সারা বিশ্বের ন্যায় আমরা কোভিড যুদ্ধে ।আর বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরাস পাল্টে দিয়েছে আমাদের চিরচেনা ঈদের প্রকৃতি, গতি এবং আমেজ।অজানা অচেনা এই ভাইরাস বদলে দিয়েছে বিশ্বচিত্র, বদলে দিয়েছে আমাদের স্বাভাবিক জীবন ধারা। আর এই ভাইরাসের প্রভাবে দেশে বিদেশে অনেকে মারা গেছেন। অনেকেই হাসপাতালে রোগ যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন। স্বজন হারানোর বেদনা সর্বত্র। কিন্তু তবুও চিরচারিত নিয়মে ঈদ আসে।ঈদ এক নির্মল আনন্দের দিন। একটি উৎসব। যা বহু পুষ্পের সুগন্ধে একত্রে মিলিত হয়ে মৌমাছিদের মতো মানুষকেও শেখায় স্নেহ-প্রেম-প্রীতি-ভালোবাসা। এছাড়া ঈদ এমন একটি দিন, যার মাধ্যমে আপনি, আমি কিংবা আমরা সকলেই নিজেদের ঐক্য সংহতি মজবুত এবং সুদৃঢ় করতে পারি।সাধারণত দীর্ঘ এক মাসের সিয়াম সাধনার পর মুসলমানদের দুয়ারে সমাগত পবিত্র ঈদুল ফিতর।আর বিশ্ববাসীর মাঝে যে আনন্দ বারবার ফিরে আসে তাকেই ঈদ বলা হয়। ইসলাম ধর্ম বিকশিত হওয়ার বহু আগে থেকেই বিভিন্ন জাতি, গোষ্ঠী ও ধর্মের অনুসারীরা নানা ভাব ও ভঙ্গিতে ঈদ পালন করতো। তবে ইসলাম ধর্মেই কেবলমাত্র ঈদকে সার্বজনীন ইবাদত রূপে রূপায়ন করা হয়েছে। গতবারের মত এবারের ঈদ আনন্দ পুরোটাই ভিন্ন। কেননা মহামারি করোনা সংক্রমণের মধ্যেই বিশ্ব মুসলিম উম্মাহ পালন করছে ঈদুল ফিতর।
মুসলিম জাহান সিয়াম সাধনা এবং ত্যাগের মধ্য দিয়ে সর্বশক্তিমান আল্লাহর কাছে নিজেকে সমর্পণ করে অতীতের ভুল-ভ্রান্তির ক্ষমা চেয়ে সিরাতুল মুস্তাকিমের পথে চলার অঙ্গীকারে প্রত্যয়ী হওয়ার এক সফল অনুষ্ঠান এ পবিত্র ঈদ। বর্তমান ঈদকে কেবল ধর্মীয় কিংবা সামাজিক উৎসব হিসেবে বিবেচনা করা হয় না বরং ঈদ আজ সার্বজনীন আনন্দের নাম। সামাজিক উৎসবগুলোয় আমরা যেমন আনন্দে মাতি, তেমনি প্রত্যেক ধর্মেই রয়েছে বিশেষ কিছু উৎসবমুখর দিন। সেই উৎসবগুলোও আমাদের আনন্দে ভাসায়। ব্যবধান ঘুচিয়ে এক করে। আমাদের বাংলাদেশেও রয়েছে নানা ধর্ম, গোত্রের মানুষের বসবাস। তাই ঈদ, পূজা, বড়দিন, বুদ্ধপূর্ণিমা, বৈসাবি, রাস পূর্ণিমা প্রভৃতি বিশেষ দিনে সবাই আনন্দে মেতে ওঠে। এসব ধর্মীয় উৎসব বৃহৎ অর্থে সামাজিক জীবনাচারেরই অনুষঙ্গ। এসব উৎসব উদযাপিত হয় সমাজের মধ্যেই। প্রতিটি উৎসব আমাদের একতা, ঐক্য, বড় ও মহৎ হতে শেখায়। ঈদের আনন্দে দল-মত-ধর্ম নির্বিশেষে সব শ্রেণির মানুষের সাথে ভাগ করার মাঝেই সর্বাঙ্গীণ কল্যাণ।তা যা হোক, ঈদ মুসলমানের জন্য একটি মহা ইবাদত। ঈদের ইবাদতে শরিয়ত নির্দেশিত কিছু বিধি-বিধান রয়েছে, যা পালনে সামাজিক জীবনে পারস্পরিক আন্তরিকতা, সহমর্মিতা ও বন্ধন সুসংহত হয়। ঈদে আমাদের দৈহিক, মানসিক ও আধ্যাত্মিক পরিশুদ্ধি ঘটে আর পরস্পরের মাঝে ঈমানী ভ্রাতৃত্ববোধ সৃষ্টি হয় এবং নিজেদের মাঝে হিংসা-বিদ্বেষ দূর হয়ে এক স্বর্গীয় পরিবেশ সৃষ্টি হয়। যদি এমনটা হয় তাহলেই আমাদের এ ঈদ পালন ইবাদতে গণ্য হবে। মুলত আমরা মুসলমানরা আল্লাহ-তাআলার আদেশে এক মাস রোজা রাখার পর তার আদেশেই আমরা ঈদের আনন্দ উদযাপন করি। আর আমরা রমজানের রোজা এ জন্যই রেখেছি, যেন আল্লাহপাকের নৈকট্য অর্জনকারী হতে পারি। এক মাস পূর্ণ হওয়ার পর আল্লাহ-তাআলা আমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন ঈদ উদযাপন করার। প্রত্যেক বৈধ কাজ যা থেকে তিনি আমাদের এক নির্ধারিত সময় বিরত রেখেছিলেন আজ ঈদ উদযাপনের মাধ্যমে তা করার অনুমতি দিয়েছেন
ঈদ উদযাপন মূলত আল্লাহ-তাআলার প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন আর কৃতজ্ঞতার সর্বোত্তম পন্থা হলো ধনী-গরিব সবাই এক হয়ে ঈদগাহে ঈদের নামাজ আদায় করা। এক মাস রোজা রাখার যে তৌফিক আল্লাহ-তাআলা দিয়েছেন এরই কৃতজ্ঞতাস্বরূপ এ দুই রাকাত নামাজ। আমরা যে ঈদ উদযাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছি, আমাদের সর্বদা এটিও স্মরণ রাখতে হবে যে, শুধু আনন্দ-ফূর্তিতে মেতে না থেকে আল্লাহপাকের ইবাদতের প্রতিও যেন দৃষ্টি থাকে।ঈদের আনন্দ তখনই সার্বজনীন রূপ লাভ করতে পারে যখন সমাজ ও দেশের সবাই একত্রে আনন্দের ভাগী হব। ঈদ যেহেতু কৃতজ্ঞতারই অপর নাম, তাই আমরা যদি ইসলামের ইতিহাসের দিকে দৃষ্টি দেই তাহলে দেখতে পাই, আল্লাহর কৃতজ্ঞতার ক্ষেত্রে সাহাবিরা কতই না উন্নত মানে ছিলেন।
আমরা যখন পুরোপুরি স্থায়ীভাবে আমাদের গরিব ভাইদের অভাব দূরীকরণের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করবো তখনই এটা আমাদের প্রকৃত ঈদ উদযাপন হবে। আমাদের এতে খুশি হওয়াও উচিত নয় যে, ঈদের দিনে গরিবদের সাময়িক খুশির উপকরণের ব্যবস্থা করে দিয়েছি বরং যাদের সামর্থ্য আছে তারা যেন তাদেরকে স্থায়ী খুশির উপকরণের ব্যবস্থা করে দেয়ার প্রতি মনোযোগ নিবদ্ধ করে। করোনা পূর্ববর্তী ঈদের তাৎপর্যকে ভূলুণ্ঠিত করে দেশ-সমাজ-জাতি লিপ্ত হয়েছিল পরস্পর হানাহানি ও ঝগড়া বিবাদে এবং একে অন্যের ওপর গর্ব ও অহমিকা প্রদর্শনে সর্বশক্তি নিয়োগ করছিল। তাই আমাদের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে বিভেদ এবং মানবতার সামনে তৈরি হয়েছে ভয়ংকর এক অদৃশ্য শক্তির প্রাচীর। করোনাকালীন ঈদ আমাদের উপহার দিতে চলেছে, জাতি-ধর্ম-বর্ণ-গোত্র-ভাষা সব ভেদাভেদ ভুলে, মানবতার শত্রু-অদৃশ্য শক্তির প্রাচীরকে ভাঙ্গতে হয় কীভাবে। আপনি, আমি কিংবা আমরা সবাই চাই, করোনাকালীন ঈদের আনন্দ উপভোগ করুক পৃথিবীর সব মানুষ সমান ভাবে। ঈদের দিন যেভাবে ধনী-গরিব ভেদাভেদ ভুলে যায়, এক কাতারে সবাই নামাজ আদায় করি, সবার সাথে হাসি মুখে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করি, ঠিক তেমনিভাবে সারাবছর একই ধারা অব্যাহত রাখতে হবে আর বিভেদের সকল দেয়ালকে ভেঙে ফেলতে হবে। আর অসহায় মানুষের দিকে হাত না বাড়িয়ে লাখ টাকার পোশাক-আশাকে আবৃত করে নিজেকে গর্বিত মনে করা ঈদ উৎসবের অংশ হতেই পারে না। তাই করোনাকালীন এ ঈদে সামর্থ্যবানদের দায়িত্ব অনেক বেশি। কষ্টে থাকা অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে মানবিকতার দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম একদিকে যেমন ইসলামি ঐতিহ্যের জয়গান গেয়েছেন, অপর দিকে মুসলমানদের ভ্রাতৃত্ববোধ বিশ্বময় ছড়িয়ে দিতে চেয়েছেন। আবার ঈদের আনন্দকে সার্বজনীন হিসেবে তুলে ধরার জন্য লিখেছেন বেশ কিছু কবিতা। ‘ঈদ মোবারক’ কবিতায় তিনি তার অভিব্যক্তি ব্যক্ত করেছেন এভাবে- শত যোজনের কত মরুভূমি পারায়ে গো/কত বালুচরে কত আঁখি ধারা ঝরায়ে গো/বরষের পর আসিলে ঈদ!/ভূখারির দ্বারে সত্তগাত বয়ে রিজওয়ানের/কণ্টকবনে আশ্বাস এনে গুলবাগের…/আজি ইসলামের ডঙ্কা গরজে ভরি জাহান/নাই বড়-ছোট -মানুষ এক সমান/রাজা প্রজা নয় কারো কেহ-।সুতারাং এবারের ঈদে আমাদের কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা, পৃথিবীর সব মানুষের করোনা ভাইরাসের এ সকল বিপদ দূরীভূত হয়ে সুখ-শান্তি, কল্যাণ ও উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি। আগামী দিনগুলো সত্য, সুন্দর ও সৌন্দর্যমণ্ডিত হোক। হাসি-খুশি ও ঈদের অনাবিল আনন্দে প্রতিটি মানুষের জীবন পূর্ণতায় ভরে উঠুক – এটাই হোক ঈদ উৎসবের কামনা।
লেখক : কলামিষ্ট, প্রাবন্ধিক ও কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক , বাংলাদেশ পরিবেশ উন্নয়ন সোসাইটি ( বাপউস) ।



ফেইসবুকে আমরা