বাংলাদেশ, , বৃহস্পতিবার, ১৭ জুন ২০২১

প্রসঙ্গ : ওয়ায়িজের সম্মানী বনাম পারিশ্রমিক ! : মো : ফেরদেীস আলম

  প্রকাশ : ২০২১-০৩-০৯ ১৩:৫০:৫০  

পরিস্হিতি২৪ডটকম : আমার কতিপয় এফবি বন্ধু কিছু দিন যাবত জিজ্ঞেস করছেন যে, একজন ওয়ায়িজ একটি মাহফিল থেকে সর্বোচ্চ কতটাকা সম্মানী নিতে পারেন?
এ প্রসঙ্গে আমার উপলব্ধি হলো [إن كان صوابا فمن الله ، وإن كان خطأ فمني ومن الشيطان]-
প্রথমত, ওয়াজের বিনিময়ের ক্ষেত্রে বতর্মানে যে হারে বাড়াবাড়ি শুরু হয়েছে তা এখন আর ‘সম্মানী’র পর্যায়ে নেই। বরং তা স্পষ্ট পারিশ্রমিক বা মজুরিতে পরিণত হয়েছে। উল্লেখ্য যে, সম্মানীর ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটে বেশি। পক্ষান্তরে পারিশ্রমিক বা মজুরির ক্ষেত্রে পরিশ্রমকারী ব্যক্তির ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটে বেশি।
দ্বিতীয়ত, ওয়াজের সম্মানী বা পারিশ্রমিক গ্রহণের ক্ষেত্রে অবস্থাভেদে হুকুমও কয়েক ধরনের হতে পারে। যেমন- সর্বোত্তম, উত্তম বা নির্দোষ, মুবাহ, মাকরূহ ও হারাম।
ক. সর্বোত্তম রীতি হলো- কোনোরূপ সম্মানী বা পারিশ্রমিক গ্রহণ করা ছাড়াই ওয়াজ করা। নবী-রাসূলগণ এ রীতিই অনুসরণ করেছেন। কাজেই দীনী দৃষ্টিকোণ থেকে একান্ত কাম্য ও প্রশংসনীয় হলো, একজন ওয়ায়িজ রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর খলীফা হিসেবে কোনোরূপ সম্মানী বা পারিশ্রমিক লাভের আশা ছাড়াই একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে পূর্ণ নিষ্ঠার সাথে কেবল দাওয়াতী চেতনা নিয়ে এ দায়িত্ব পালন করবেন। এ অবস্থায় তিনি তাঁর মহৎ কাজের জন্য পূর্ণ পুরস্কার আল্লাহ তা‘আলার কাছে পাবেন।
খ. উত্তম বা নির্দোষ রীতি: যদি কোনো ওয়ায়িজের নিজের ও পরিবারের খরচ মিটানোর জন্য কোনো ব্যবস্থা না থাকে, তাহলে এতে কোনো দোষ নেই যে, তিনি প্রয়োজনীয় রাহ খরচা নিতে পারবেন এবং একান্ত জরুরত মাফিক দৈনিক খরচা নিতে পারবেন, যা কোনোক্রমেই নিজের একান্ত প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত হবে না। ধরুন, একজন মধ্যবিত্তের নিজের ও পরিবারের খরচ মিটানোর জন্য মাসে আনুমানিক ৬০,০০০/= থেকে ১,০০,০০০/= টাকা লাগে। তাহলে তিনি রাহখরচা ব্যতীত দৈনিক সর্বোচ্চ প্রায় ২৫০০/= থেকে ৩৫০০/= টাকা নিতে পারেন, যদি তিনি দিনে একটি মাহফিলে অংশগ্রহণ করেন। আর যদি তিনি একাধিক মাহফিলে অংশগ্রহণ করেন, তাহলে রাহখরচা ব্যতীত কোনো মাহফিল থেকে ২০০০/= টাকার অতিরিক্ত গ্রহণ করা সঙ্গত হবে না। উল্লেখ্য যে, এরূপ অবস্থায় তিনি যেহেতু তাঁর এ কাজের কিছু বিনিময় মানুষের নিকট গ্রহণ করেছেন, তাই তিনি এ কাজের পূর্ণ সওয়াব আল্লাহ তা‘আলার কাছে পাবেন না। তিনি যে পরিমাণ খরচা গ্রহণ করেন সেই অনুপাতে আল্লাহর নিকট সওয়াব থেকে বঞ্চিত হবেন।
গ. মুবাহ : যদি কোনো ওয়ায়িজের নিজের ও পরিবারের খরচ মিটানোর জন্য ভালো ব্যবস্থা থাকে, তাহলে তিনি যদি রাহখরচা ব্যতীত দরাদরি না করে প্রচলিত প্রথা অনুসারে যৌক্তিক পরিমাণ সম্মানী গ্রহণ করেন, তাতে অসুবিধা নেই। তবে এ অবস্থায় তিনি যেহেতু তার একান্ত প্রয়োজন ব্যতীত ওয়াজের বিনিময় মানুষের নিকট থেকে গ্রহণ করেন, তাই তিনি আল্লাহর কাছে তাঁর এ কাজের সওয়াব আশা করতে পারেন না।
ঘ. মাকরূহ: দরাদরি করে ওয়াজের বিনিময় গ্রহণ করা মাকরূহ। এভাবে ওয়াজের বিনিময়ে গৃহীত অর্থ সম্মানীর পর্যায়ে থাকবে না; বরং পারিশ্রমিক বা মজুরির পর্যায়ে পর্যবসিত হবে। শরী‘আতের দৃষ্টিতে এটা মোটেই সমর্থনযোগ্য নয় যে, কোনো ওয়ায়িজ ওয়াজকে উপার্জনের একান্ত পেশায় পরিণত করবেন এবং দরাদরি করে অতিরিক্ত পারিশ্রমিক আদায় করবেন। এভাবে বিনিময় গ্রহণ করা মাকরূহ এবং এরূপ বিনিময় গ্রহণকারী পেশাদার ওয়ায়িজ আল্লাহ তা‘আলার কাছে পুরস্কার পাওয়ার পরিবর্তে শাস্তি পাওয়ার উপযোগী হবে। আদ-দুররুল মুখতার-এ উল্লেখ করা হয়েছে, التَّذْكِيرُ … وَلِرِيَاسَةٍ وَمَالٍ وَقَبُولِ عَامَّةٍ مِنْ ضَلَالَةِ الْيَهُودِ وَالنَّصَارَى . অর্থাৎ নেতৃত্ব লাভ কিংবা সম্পদ অর্জন অথবা সর্বসাধারণের নিকট গ্রহণযোগ্যতা লাভ করার জন্য ওয়াজ করা ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টানদের গুমরাহী। মুফতী আহমদ রেযা খান বেরলভীও বলেন, ‘‘ওয়াজ-নসীহতকে সম্পদ উপার্জন কিংবা লোকজনকে নিজের ভক্ত বানানোর মাধ্যমে পরিণত করা গোমরাহী ও প্রত্যাখ্যাত এবং ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টানদেরই কুপ্রথা। (বেরলভী, ইরশাদাত-ই আ‘লা হযরত, পৃ. ৮৮)
ঙ. হারাম: ওয়াজের জন্য অগ্রিম অর্থ গ্রহণ করে মাহফিলে অংশগ্রহণ না করা এবং অগ্রিম গৃহীত অর্থ যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে ফেরত না দেওয়া চরম গর্হিত কাজ। এ অগ্রিম অর্থ ভক্ষণ করা হারাম। এটা প্রকারান্তরে অন্যের সম্পদ অবৈধভাবে ভক্ষণের নামান্তর। (ডক্টর আহমদ আলী স্যার)
লেখক : শিক্ষাবিদ



ফেইসবুকে আমরা