বাংলাদেশ, , সোমবার, ২০ মে ২০২৪

শিশুর দাঁতের আলাদা যত্নের প্রয়োজন : ডা. মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন

  প্রকাশ : ২০২৩-০৩-০৬ ১৫:২০:৫৮  

পরিস্থিতি২৪ডটকম : প্রতি বছর ৬ই মার্চ তারিখে পালিত হয়ে থাকে ‘ওয়ার্ল্ড ডেন্টিস্টস্ ডে’। দিবসটিকে ঘিরে পৃথিবীব্যাপী মুখ ও দাঁতের স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধিতে নেওয়া হয় নানা কার্যক্রম। বেশ কয়েক বছর ধরে এদেশেও চোখে পড়ার মতো নানা উদ্যোগের ভেতর দিয়ে পালিত হচ্ছে দিবসটি। আর এসবের উদ্দেশ্য একটাই, মানুষকে সচেতন করা। এ বছর -২০২৩ সালের ৬ই মার্চ সোমবার ‘ওয়ার্ল্ড ডেন্টিস্টস্ ডে’ পালিত হবে। মুলত এদিন দেশব্যাপী ডেন্টিস্টরা নানা সভা সেমিনার, বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রার মাধ্যমে সচেতনতা বৃদ্ধিসহ দাঁতের যত্নে, দাঁত এবং মুখের রোগ প্রতিরোধ এবং করণীয় সম্পর্কে বিভিন্ন আলোচনা করেন। বৃহত্তর চট্টগ্রাম ডেন্টাল এসোসিয়েশন ও বাংলাদেশ ডেন্টাল এসোসিয়েশন চট্টগ্রাম জেলা শাখার পক্ষ থেকে সকলের প্রতি ‘ওয়ার্ল্ড ডেন্টিস্টস্ ডে’র শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। ‘দাঁত থাকতে দাঁতের মর্ম বোঝা’ কথাটি যদিও আমাদের জীবনে প্রবাদ হয়ে এসেছে এবং প্রবাদটি দিয়ে পরক্ষভাবে যে কোন বিষয়ের গুরুত্ব সম্পর্কে বোঝানো হয়ে থাকে। তবে প্রবাদ হয়ে এলেও দাঁতের গুরুত্ব কিন্তু আমাদের জীবনে অপরিহার্য। বিশেষ করে আপনার মুখের বা চেহারার সৌন্দর্যের জন্য। ধরুন একটি মানুষকে সুন্দর বলার জন্য যেসমস্ত গুনাবলি থাকা দরকার তা আপনার শরীরের ও চেহারায় পরিপূর্ণ ভাবেই আছে। কিন্তু আপনি যখনি হাসেন তখন যদি দেখা যায় আপনার মুখে সামনের দুটি দাঁত নেই তখনই কিন্তু আপনার সমস্ত সৌন্দর্য মাটি হয়ে যাবে নিমিষেই। অথচ আপনার আমার শরীরের একটি ছোট অংশ জুড়ে এই দাঁতের অবস্থান। আকৃতিতে ছোট হলেও গুরুত্ব বিবেচনা করেই বোধহয় প্রবাদে উঠে এসেছে দাঁতের নাম। চিকিৎসা শাস্ত্রে জায়গা করে নিয়েছে “দন্ত্যচিকিৎসা” নামে। দন্ত্যচিকিৎসা শব্দটি এসেছে দন্তলোজি থেকে। দাঁতের গঠন, ক্রমবিকাশ ও অস্বাভাবিকতার শিক্ষাই দন্তলোজি। বিষয়বস্তুর সাদৃশ্যের কারণে কোন কোন জায়গায় দন্ত্যচিকিৎসা এবং মৌখিক চিকিৎসাশাস্ত্র (মুখের বিভিন্ন সমস্যা ও রোগের শিক্ষা) দুই নামই ব্যবহৃত হয়ে থাকে। আর ডেন্টাল বললে আমরা অনেকেই দাঁত বুঝি। সাধারণের ধারণা ডেন্টাল সার্জন বা ডেন্টিস্টরা দাঁত তোলে বা দাঁতে ব্যথা হলে নিরাময় করে। কিন্তু ডেন্টাল শব্দের অর্থ শুধু দাঁত নয়। দাঁত সম্পর্কিত সকল কিছুই তাঁরা চিকিৎসা করেন। ডেন্টিস্ট্রির একটি সংজ্ঞা দিয়েছে আমেরিকান ডেন্টাল অ্যাসোসিয়েশনে। এটি একটি বিজ্ঞান ও শিল্প। যেখানে মুখের অভ্যন্তরের সবকিছুর রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসা করা হয়। এর সঙ্গে রোগের প্রতিরোধ, মুখের আঘাত বা জন্মগত ত্রুটি এসব ডেন্টিস্ট্রির আওতাধীন। সহজ করে বললে আমাদের চোয়ালের হাড়, ঠোঁট, জিহ্বা, তালু, মুখের স্নায়ু, লালাগ্রন্থি সবকিছুই ডেন্টাল চিকিৎসার অন্তর্গত। এমন বিষয়টি অনেকেরই অজানা। শিশুকাল থেকেই সন্তানের দাঁতের যতœ নেওয়া জরুরী। অনেক সময় অসাবধানতা বশত: বা অজ্ঞতায় তা হয়ে উঠেনা। ধীরে ধীরে শিশুটি যখন বড় হতে থাকে তখন নানা দন্ত সমস্যায় জর্জরিত হতে পারে আর তার পরিনাম ভয়াবহ হতে পারে। তাই শিশুদের দাঁতের যত্ন নিতে হবে সবার আগে। শিশুদের দাঁত নিয়ে অনেক মা-বাবা ভাবেন না। শিশুর দাঁতেরও যে আলাদা যত্নের প্রয়োজন সে সম্পর্কে সচেতন নন। আবার ব্যাথা হলেও ডেন্টিস্টের কাছে আসেন না। তাদের ধারণা ব্যথা হলে দাঁত এমনিতেই পড়ে যাবে। গবেষণায় দেখা যায় প্রতি চারজন শিশুর একজনের দাঁতের ক্ষয় শুরু হয় শিশু বয়সে এবং ১২ থেকে ১৫ বছরের প্রায় ৫০ শতাংশ ছেলেমেয়েদের দাঁতের ক্যারিজ থাকে। এমনও রোগী আছে যারা ডেন্টিস্টকে দাঁত দেখাতে লজ্জা পান। দাঁত ও মুখের অসুস্থতা নিয়ে একাই লড়াই করেন। শেষ পর্যন্ত যখন পেরে ওঠেন না তখন ডেন্টিস্টের কাছে আসেন। অথচ এটা একটি রোগ মাত্র। রোগের জন্য আপনাকে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতেই হবে। শিশু জন্মের পর ছয় মাস বয়সে প্রথম দাঁত আসে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে এ সময় কম-বেশি হতে পারে। সন্তানের প্রথম দাঁত ওঠা প্রত্যেক মা-বাবার জন্য অনেক আনন্দের। নিচের মাড়ির সামনের দিকে দুটি দাঁত প্রথম ওঠে। এরপর ধীরে ধীরে বাকি ১৮টি দুধ দাঁত অর্থাৎ মোট ২০টি দুধ দাঁত শিশুর মুখে আসে। এ সময় থেকেই শিশুদের দাঁতের যত্ন প্রয়োজন। শিশুকে ফিডারে দুধ খাওয়ালে ফিল্ডারের নিপলের চাপে তার মাড়ি উঁচু হয়ে যায়। অনেক সময় শিশুরা মুখে আঙুল দিয়ে থাকে। এতে দাঁত উঁচু-নিচু হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। মুখে ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশন হতে পারে আঙুল ও ফিডার ব্যবহারে। এজন্য দুধ খাওয়ানোর পরপরই বাচ্চার মুখটা পরিষ্কার করে দিতে হবে। একটি আঙুলে পরিষ্কার সুতি কাপড় নিয়ে মুখ পরিষ্কার করে দিতে হবে। ফিডারের পরিবর্তে শিশুদের চামচ দিয়ে দুধ খাওয়ানো বেশি ভালো। এখন ভালো মানের ফিঙ্গার ব্রাশ পাওয়া যায়। এগুলো দিয়েও শিশুর মুখ ও দাঁত পরিষ্কার করা যেতে পারে। শিশুরা ব্রাশ করার ক্ষেত্রে পেস্ট ব্যবহার করতে পারবে। তবে তা কম নিতে হবে। শিশুদের জন্য আলাদা টুথপেস্ট বাজারে রয়েছে। কখনো বড়দের টুথপেস্ট দিয়ে শিশুদের দাঁত ব্রাশ করানো যাবে না। শিশুদের দুধ দাঁত পড়ে স্থায়ী দাঁত ওঠে। অনেক ক্ষেত্রে শিশুদের দুধ দাঁত কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত (ক্ষয়) হলে ফেলে দিতে বলেন অভিভাবকরা। এটি করা যাবে না। প্রত্যেকটি দাঁত ওঠার এবং পড়ে যাওয়ার নির্দিষ্ট সময় রয়েছে। তার আগে দুধ দাঁত ফেলা হলে, স্থায়ী দাঁত উঠলে আঁকাবাঁকা হবে। বরং দাঁত ক্ষয় হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে এবং ফিলিং করে দিতে হবে। ভালো দাঁতের জন্য কিন্তু বাচ্চার খাওয়া দাওয়ার উপরেও নজর রাখতে হবে৷ অতিরিক্ত মিষ্টি, চকোলেট, পপসিকেল জাতীয় চটচটে খাবার না খাওয়াই ভালো৷ বাচ্চা যদি প্রতি নিয়ত কিছু না কিছু খেতেই থাকে তাহলেও সেটা দাঁতের পক্ষে ক্ষতিকর ৷ কারণ স্যলাইভা দাঁত পরিষ্কার করতে সাহায্য করে৷ অনবরত কিছু খেতে থাকলে সেই সম্ভাবনাটা কমে যায়৷শিশুর দাঁতের যত্ন বোঝা খুবই গুরুত্বপূর্ণ কারণ শিশুরা বড় হয়ে উঠছে। পিতামাতারা আপনার সন্তানের ভবিষ্যত দাঁতের স্বাস্থ্যের সুরক্ষা হিসাবে এটি সম্পর্কে ভাবেন। আপনার সন্তানদের আপনার মতো দাঁতের সমস্যার মধ্য দিয়ে যেতে দেবেন না। যেহেতু দাঁতের সমস্যাগুলি শৈশব থেকেই প্রতিরোধযোগ্য, তাই এখন তাদের দাঁতের যতœ নেওয়া তাদের জীবনের পরবর্তী পর্যায়ে সাহায্য করবে। শিশুর দাঁত ওঠার আগে পরিষ্কার সুতি কাপড় উষ্ণ পানিতে ভিজিয়ে পরিষ্কার করে দিতে হবে। দাঁত ওঠার পর নরম বেবি টুথ ব্রাশ দিয়ে সতর্কতার সঙ্গে দাঁত ও জিহ্বা পরিষ্কার করতে হবে। বেবি টুথ পেস্ট না পেলে বা খেয়ে ফেলার আশঙ্কা থাকলে পেস্ট না দিলেও চলবে। দাঁতের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বুকের দুধের বিকল্প নেই। সচেতনতার অভাবে প্রাথমিক দাঁত বা শিশুর দুধদাঁত অনেক সময় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দুধদাঁতের স্থায়িত্বকাল অল্প হলেও এগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। দুধদাঁতের শিকড়ের নিচে স্থায়ী দাঁতের গঠন শুরু হয়। কাজেই দুধদাঁতের সংক্রমণ স্থায়ী দাঁতকেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এ ছাড়া স্পস্ট উচ্চারণ, চোয়ালের গঠন ও মুখের আকৃতি ঠিক রাখা এবং স্থায়ী দাঁত সঠিক জায়গায় গজানোর বিষয়টিও দুধদাঁতের ওপর নির্ভরশীল। শিশুর স্মৃতিশক্তি, আত্মবিশ্বাস, প্রাণচঞ্চলতা, লেখাপড়ায় মনোনিবেশসহ মানসিক বিকাশেও দুধদাঁত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই শিশুর দাতেঁর যত্নে সচেতন থাকতে হবে সব সময়। মানবসভ্যতার ইতিহাস যত দিন ধরে ডেন্টিস্ট-এর ইতিহাস ততদিন। পেশাগত বিকাশ না ঘটলে উন্নত সেবা প্রদান করা সম্ভব না। তাই প্রাথমিক দন্ত চিকিৎসক ও জাতীয় চিকিৎসক সহ আন্তর্জাতিক ডেন্টাল সার্জনদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ গড়ে ওঠা ও পেশাগত অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মাধ্যমে পেশাগত দক্ষতা ও সেবার মান বৃদ্ধির লক্ষে এই দিবসটি পালন করা অতীব প্রয়োজন। এছাড়া ‘ওয়ার্ল্ড ডেন্টিস্টস্ ডে, এর মাধ্যমে জনগণের মাঝে দাঁতের যত্নে সচেতনতা সৃষ্টি করা যায় এবং দাঁত ও মুখের যত্নে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করা যায়। দাঁতের যত্নে ডেন্টাল চেক-আপের বিষয়টি সাধারণ জনগণকে উৎসাহিত করে এ দিনটি উদযাপনের মাধ্যমে। সামান্য সচেতনতা ও যত্ন আমাদের বাঁচাবে দাঁতের বিভিন্ন সমস্যা থেকে। তাই ছোটবেলা থেকেই দাঁতের যত্ন নিন। আপনার হাসি ও ব্যক্তিত্বকে করে তুলুন আরও বেশি আকর্ষণীয়।

লেখক : প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট, সভাপতি- বৃহত্তর চট্টগ্রাম ডেন্টাল এসোসিয়েশন



ফেইসবুকে আমরা