বাংলাদেশ, , সোমবার, ২৭ জুন ২০২২

বিদ্যাপীঠগুলোতে যৌন সন্ত্রাসের নগ্ন থাবা বন্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলুন : ডা. মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন

  প্রকাশ : ২০১৯-০৫-০৫ ১৪:১৯:৪৫  

পরিস্হিতি২৪ডটকম : সাধারণত জ্ঞান বা দক্ষতা অর্জনই শিক্ষা। ব্যাপক অর্থে পদ্ধতিগতভাবে জ্ঞান লাভের প্রক্রিয়াকেই শিক্ষা বলে। তবে শিক্ষা হলো সম্ভাবনার পরিপূর্ণ বিকাশ সাধনের অব্যাহত অনুশীলন। আর শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড ও শিক্ষকদের বলা হয়ে থাকে মানুষ গড়ার কারিগর। এসব ছাড়া কোনও জাতি সভ্য হতে পারে না। যে দেশ বা জাতির শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষক-শিক্ষিকা ইত্যাদি যত বেশি উন্নত ও আধুনিক সেই দেশ বা জাতি তত বেশি উন্নতি সাধন করেছে। এমনও দেশ আছে যে দেশের প্রায় সবাই শিক্ষিত বা প্রকৃত শিক্ষার হার খুবই বেশি। এ ব্যাপারে আমরা শ্রীলঙ্কার উদাহরণ টানতে পারি। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো যেমন শিক্ষার্থীদের জন্য খুবই উপযোগী তেমনি শিক্ষক-শিক্ষিকা বা পাঠদানকারীরাও শিক্ষার্থীদের খুব আপনজনের মতো। আসলে শিক্ষার্থী ও শিক্ষক-শিক্ষিকাদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নত বা ভাল থাকতে হয়। উন্নত দেশগুলো এসব বিষয়ে খুবই গুরুত্ব দেয়, কিন্তু যত সমস্যা অনুন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোতে। এসব দেশ এসব ব্যাপারে তেমন গুরুত্বই দেয় না। যে কারণে অনেক দেশ প্রকৃত শিক্ষার হার যেমন কাক্সিক্ষত হারে বাড়াতে পারছে না তেমনি অনেক ক্ষেত্রে যথাযথ সফলতাও অর্জন করতে পারছে না। যেমন আমাদের বাংলাদেশে নামকরা বা বড় বড় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অভাব নেই। প্রচুর বড় বড় ডিগ্রিধারী শিক্ষক-শিক্ষিকাও আছেন এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। তারপরও শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা এখন পর্যন্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষকের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিবর্গদের আচরণ বা শিষ্টাচার সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে নানা সমস্যায় পড়েন।
প্রকৃত শিক্ষা বা জ্ঞান অর্জন, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা (শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে) ইত্যাদি বিষয় নিয়ে এখনও দুশ্চিন্তা করতে হচ্ছে শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের। বিশেষ করে মেয়ে শিক্ষার্থীদের নিয়ে অভিভাবকদের দুশ্চিন্তা যেন আরো বেশি। কারণ, মাঝে মধ্যেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের ছাত্রী কেলেংকারির খবর প্রকাশ পাচ্ছে গণমাধ্যমে। হঠাৎ করে এ ধরনের ঘটনা ফের বেড়েছে উদ্বেগজনকহারে। শিক্ষকদের দেখাদেখি একশ্রেণীর ছাত্র বা বখাটেরাও একের পর এক এ ধরনের জঘন্যতম ঘটনা ঘটাচ্ছে, যা কিছুতেই মেনে নেয়া যায় না। সম্প্রতি সময়ে প্রতিদিন দেশের কোন না কোন প্রান্তে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক দ্বারা কোমলমতি শিক্ষার্থীদের যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটছে অহরহ। হয়তো পত্রিকার পাতা উল্টালে আমরা কয়েকটা ঘটনার চিত্র দেখি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সামাজিক লোকলজ্জার ভয়ে ভুক্তভোগী তা প্রকাশ করে না। এই ঘটনায় অভিযুক্তদের তালিকায় মাদরাসার শিক্ষক, মসজিদের ইমাম, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকও বাদ পড়ে না। যা উদ্বিগ্ন হওয়ার বিষয়। সম্প্রতি ফেনীর সোনাগাজীতে এক মাদরাসা ছাত্রী অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ তোলা ও তার প্রতিবাদ করায় অধ্যক্ষের নেতৃত্বে বখাটেরা আগুন সন্ত্রাসে লিপ্ত হয়ে প্রতিবাদকারীর গায়ে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। এতে প্রতিবাদকারী ঐ শিক্ষার্থীর নির্মম মৃত্যু হয়। এই পৈশাচিক ঘটনায় দেশ এখন তোলপাড়। উক্ত ঘটনায় দোষী মাদরাসার অধ্যক্ষ ও অভিযুক্তরা আইনের আওতায়। চলছে তাদের বিচার। কিন্তু যারা ভোক্তভোগী তাদের হাহাকার আমাদের ব্যথিত করে তোলে। এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার প্রেক্ষিতে মেয়ে শিক্ষার্থীদের পরিবার পরিজনরা আরো বেশি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে এইরকম ন্যাক্কারজনক ঘটনা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে ভাবিয়ে তুলছে।
অনেকে বলছেন, দু-একজন শিক্ষকের অপকর্মের কারণে সব শিক্ষককে খারাপ বলা যাবে না। হ্যাঁ, আমরা এর সঙ্গে একমত। কিন্তু দু-একজন শিক্ষকের এ ধরনের বর্বর ও জঘন্যতম আচরণের কারণে সবাই যখন প্রায় সব শিক্ষকের ওপর এর দায়ভার চাপাতে চাইছে তখন তা থেকে মুক্তির উপায় কী? সংখ্যালঘিষ্ঠ এসব শিক্ষকের কারণেই ‘শিক্ষক’ শব্দটিই যে আজ প্রশ্নবিদ্ধ হলো।
শিক্ষকের নির্যাতন বা যৌন নির্যাতনের ভয়ে অনেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়া থেকে বিরত থাকে। এসব অভিযোগে অনেকে বর্জন করে ক্লাস। এ ধরনের শিক্ষকদের ‘শিক্ষা ক্ষেত্রের কলঙ্ক’ বলা যেতে পারে। একটি বিষয় অনেক আগেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তাহলো শিক্ষকরা ছাত্রদের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানোর চেয়ে ছাত্রীদের ওপর তা চালাতেই যেন বেশি আগ্রহী। সামান্য শাস্তি প্রদানের নামেও অনেক সময় ছাত্রীদের গায়ে শিক্ষকের হাত পড়ে। গ্রামে স্কুলের বড় বড় ছাত্রীর গায়ে অনেক শিক্ষক হাত দেয়। বেশিরভাগ ছাত্রীর সরলতার সুযোগ নিয়েই শিক্ষকরা এসব করে থাকে।
আমাদের সমাজে এখনো এমন একশ্রেণীর মানুষ বা অভিভাবক আছেন যারা মনে করেন পড়ালেখা শিখতে গেলে শিক্ষকদের শাস্তি পাওয়া দরকার। এ দুর্বলতার সুযোগও কাজে লাগাচ্ছে শিক্ষকরা। শিক্ষকরা এখন ছাত্রীদের ওপর চড়াও হওয়ার নানা সুযোগ ও কৌশল খুঁজে বেড়াচ্ছে। তবে ভাল শিক্ষক যে নেই তা বলা যাবে না। শিক্ষার্থীর ওপর শিক্ষকের নির্যাতন মৃত্যুর মতো ঘটনাও ঘটাতে পারে। মনোবিজ্ঞানীরা বলেছেন, নির্যাতনের কারণে অনেকে মানসিক ভারসাম্যও হারিয়ে ফেলতে পারে। এদিকে শিক্ষাবিদরা বলেছেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে বা তা রক্ষার্থে শারীরিক শাস্তি কোনও সমাধানের পথ হতে পারে না, বরং তার নেতিবাচক প্রভাবই বেশি। অকালে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার পেছনে এটাও একটা কারণ। এর চরম নেতিবাচক প্রভাব পড়ে সমাজ ব্যবস্থার ওপর। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হোক বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বাইরে হোক যৌন হয়রানি রোধে বিভিন্ন আইন রয়েছে। যেমন: ১৮৬০ সনের দণ্ডবিধি আইনের ৩৫৪ ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি কোনো নারীর শালীনতা নষ্ট করার অভিপ্রায়ে বা সে এর দ্বারা তার শালীনতা নষ্ট করতে পারে জেনেও তাকে আক্রমণ করে বা অপরাধমূলক বলপ্রয়োগ করে, তাহলে সে ব্যক্তি ২ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডে বা জরিমানা দণ্ডে বা উভয় প্রকার দণ্ডে দণ্ডিত হবে। আর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ৯ (খ) ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি কোনো নারী বা শিশুকে ধর্ষণের চেষ্টা করেন, তাহলে উক্ত ব্যক্তি অনধিক ১০ বছর কিন্তু অন্যূন ৫ বছর সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় হবেন এবং এর অতিরিক্ত অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০-এর ৯ ধারা অনুযায়ী যদি কোনো পুরুষ কোনো নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করেন, তাহলে তিনি যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় হবেন এবং এর অতিরিক্ত অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত হবেন। ধর্ষণ পরবর্তী নারী বা শিশুর মৃত্যু ঘটলে উক্ত ব্যক্তি যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন এবং এর অতিরিক্ত অন্যূন ১ লাখ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডনীয় হবেন এবং দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর ২৯৪ ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি অন্যদের বিরক্তি সৃষ্টি করে কোনো প্রকাশ্য স্থানে কোনো অশ্লীল কার্য করে অথবা কোনো প্রকাশ্য স্থানে বা তার সন্নিকটে কোনো অশ্লীল গান, গাথা, সঙ্গীত বা পদাবলী গায়, আবৃত্তি করে বা উচ্চারণ করে, তাহলে সে ব্যক্তি ৩ মাস পর্যন্ত যে কোনো ধরনের কারাদণ্ডে বা জরিমানা দণ্ডে বা উভয় প্রকার দণ্ডে দণ্ডিত হবে। এত কিছুর পরেও উদ্বিগ্নহারে বাড়ছে যৌন হয়রানিরমত ঘটনা। যৌন লিপ্সায় অভিযুক্তদের তালিকা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। আর যৌন হয়রানির তালিকায় রয়েছে শিশু, কিশোরী, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গামী ছাত্রী, বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে নিয়োজিত নারী শ্রমিক, নারী কর্মচারী, কর্মকর্তা, আইনজীবী, সাংবাদিক, ডাক্তারসহ সব পর্যায়ের নারী। গণপরিবহনেও নারীরা যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন। এই যৌন লিপ্সা বা হয়রানি রোধে সম্মিলিত প্রচেষ্টা রুখতে পারে এর ভয়াবহতা। এই যৌন হয়রানি বন্ধে যারা ভূমিকা রাখতে পারেন: (১) পরিবারের সদস্যরাও একে অপরকে সচেতন করতে পারেন। (২) শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষিকা। (৩) কর্মক্ষেত্রের সহকর্মী। (৪) রাস্তাঘাটে চলাচলকারী সাধারণ জনগণ। (৫) আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। (৬) বিজ্ঞ আদালত। (৭) ভ্রাম্যমাণ আদালত। (৮) জনপ্রতিনিধি। (৯) সাংবাদিকসহ বিভিন্ন পেশা ও শ্রেণীর সচেতন মানুষ। আলোচিত কৌশলে বা উপায়ে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ করা যেতে পারে: (১) যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। (২) শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, ক্লাসরুমে যৌন হয়রানি সম্পর্কে আলোচনা করা এবং এর নেতিবাচক বিষয়গুলো তুলে ধরা। (৩) যৌন হয়রানি উৎসাহিত হয় গণমাধ্যমে এমন বক্তব্য, বিজ্ঞাপন, নাটক ইত্যাদি প্রচার না করার পক্ষে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা। (৪) আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সচেতন ও কার্যকর করা। (৫) যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটলে সবাই ভিকটিমের পাশে দাঁড়ানো। (৬) স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি গঠন ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম গ্রহণ করা। এছাড়াও উপজেলা পর্যায়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার, সহকারী কমিশনার (ভূমি) এবং সংশ্লিষ্ট থানার অফিসার ইনচার্জ বরাবর লিখিতভাবে এবং উপস্থিত হয়ে লিখিত বা মৌখিক অভিযোগ দায়ের করতে পারেন। জেলা পর্যায়ে বিজ্ঞ জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে অবহিত করতে পারেন।
আশা করি এতে প্রতিকার পাওয়া সম্ভব। এরপরও নারীর প্রতি সহিংসতা নয় মানবিকতার মূল্যবোধ জাগিয়ে তুলতে হবে। কেননা তারা আমাদের মা-বোন-কন্যা এবং সর্বপরি পরিবারের অংশ। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি রক্ষায় শিক্ষকদের সচেষ্ট হয়ে এগিয়ে আসতে হবে। অভিযুক্তদের আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি সামাজিকভাবে বয়কট করতে হবে। আসুন, সবাই যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলি। আমাদের কন্যা, জায়া ও জননীদের পথচলা নিরাপদ করতে সবাই এগিয়ে আসি।

লেখক: কলামিস্ট ও প্রাবন্ধিক; সভাপতি, বৃহত্তর চট্টগ্রাম ডেন্টাল এসোসিশেন।



ফেইসবুকে আমরা