বাংলাদেশ, , শনিবার, ২৮ মে ২০২২

তরিকতের অবিনশ্বর হিরন্ময়ী জ্যোতি আল্লামা সৈয়দ শামসুল হক মুহাম্মদ জালালউদ্দীন (ক.)

  প্রকাশ : ২০২০-০১-২৮ ১৬:৫৭:৫১  

পরিস্হিতি২৪ডটকম/এস. এম. ওসমান : ইসলাম প্রচারের ইতিহাসে আউলিয়ায়ে কেরামের ভূমিকা গৌরবোজ্জ্বল, তারা আপন জন্মভূমির মায়া ত্যাগ করে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে ইসলামের আলোকবর্তিকা নিয়ে হাজির হয়। তেমনি চট্টগ্রামও তাদের পদচারণ থেকে বাদ যায়নি। যারা এদেশে ইসলাম প্রচারে আত্মনিয়োগ করে নওমুসলিমদের ফেলে নিজ দেশে ফিরেনি তাদের মধ্যে হযরত মাহী আসওয়ার (রহ.) তথা হালিশহর দরবার শরীফের পূর্বপুরুষ অন্যতম।
শত বছর পূর্বে এই সৈয়দ পরিবারে জন্ম নেন সুলতানুল আউলিয়া কুতুবুল আকতাব হযরত সৈয়দ হাফেজ মুনির উদ্দীন নুরুল্লাহ (র.)। হাফেজী পড়ার সময় (হুজুরের মামা) এনায়েত বাজারের নজু সওদাগর হযরত আহমদুল্লাহ (ক.) মাইজভাণ্ডারীর দরবারে নিয়ে যান। ঐ দিন হযরত কেবলা (ক.) মুরিদানগণকে বললেন, আজ আমার দরবারে শরীয়তের সম্রাট আসবে। তোমাদের ঢোল-তবলা উত্তর বিলের উত্তর মাথায় রেখে আস। সকাল থেকে সবাই দরবার শরীফে অধীরে আগ্রহে অপেমাণ। মেহমানকে না দেখে শেষবেলায় একজন জিজ্ঞাসা করলে হযরত বলেন, কেন তোমরা দেখনি ছোট ছেলে এসেছিল, তিনিই তো।


হাফেজ সাহেব হুজুরের বড় ভাই সৈয়দ মৌলানা জমির উদ্দিন(রহ.)বাড়ীতে ভারতের প্রখ্যাত পীরে তরীক্বত হযরত সৈয়দ হাফেজ হামেদ হাসান আলভী আজম গড়ি(রা.)। হাফেজ সাহেব হুজুর পীর ছাহেব কেবলার (রহ.) এর খেতমতে নিয়োজিত ছিলেন কিন্তু তরিক্বতের দীক্ষা গ্রহণ করেন নি। মৌলানা জমির উদ্দিন (রহ.) বাড়ী ত্যাগ করার সময় পীর ছাহেব হুজুর হাফেজ ছাহেব হুজুরকে বললেন, ‘মনির মাই তুমারে লিয়ে আইয়া তুম এক নজর বি নিহী দেখা।’ হাফেজ সাহেব হুজুরের মকাম বর্ণনা করতে গিয়ে হাফেজ হামেদ হাসান আলভী হুজুর বলেন, নজির বে নজির হে, মনির আওয়ার হে। এই প্রচারবিমুখ দরবারের অন্য মাশায়েকগণকে নিয়ে অন্য সময় আলোচনা করব ইনশ-আল্লাহ।
চট্টগ্রাম তথা উপমহাদেশে যে ‘ক’জন ইসলামী শরিয়তের পাবন্ধকারী পীরের সাথে আমার দেখা করার সৌভাগ্য হয়েছে তার মধ্যে কুতুবুল এরশাদ গাউছে জামান হযরত আলহাজ্ব আল্লামা সৈয়দ শামসুল হক মুহাম্মদ জালাল উদ্দীন (র.) অন্যতম। এই মাশায়েখে তরীক্বতে আবির্ভাব থেকে ওফাত পর্যন্ত সম্পূর্ণ এক কুদরতের রহস্যে ভরপুর।
হুজুরের জন্মের সময় বাচ্চা না হয়ে আম্মাজান থেকে টিউমার সদৃশ (রক্তের পিণ্ড) বের হয়। যা পরে হুজুরদের পশ্চিমে রেললাইনের ওপারে ফেলে দেওয়ার জন্য রাখা হয়। এই খবর তাহার দাদাজান সুলতানুল আউলিয়ার কাছে পৌঁছলে তিনি সৈয়দ মাহমুদুল হককে রক্ত পিণ্ডটি দেখাতে বলেন। তিনি(কামালের বাপ) গিয়ে রক্ত পিণ্ডটি নিয়ে আসেন এবং তা ধারালো অস্ত্র দিয়ে পৃথক করে তার থেকে বের করে হুজুর মহিউত তরিক্বতকে । যা দ্বারা এই ধরাপৃষ্ঠে প্রকাশ পায় “এক কুদরত”।
হালিশহর দরবারের আধ্যাত্মিক শরাফতের প্রতিষ্ঠাতা খাজায়ে বাঙাল সুলতানুল আউলিয়া কুতুবুল এরশাদ হযরত হাফেজ মুনির উদ্দীন নুরুল্লাহ (র.) নিজের বংশে কত বড় আল্লাহর অলি এসেছিলেন তা সেদিন প্রকাশ না করলেও ধীরে ধীরে জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে এমনকি দেশ বিদেশে ছড়িয়ে পড়ে সুরভিত সুঘ্রাণ।
এই অলৌকিক মানুষটি ছাত্রজীবনে তীক্ষ্ণ মেধা ও আদর্শের অধিকারী থাকায় ওস্তাদমণ্ডলীর কাছে সমাদৃত হয়। এই রাহবারে শরিয়ত চট্টগ্রামের প্রাচীনতম দ্বীনি শিক্ষা নিকেতন ছোবহানিয়া আলীয়া মাদ্রাসা থেকে ‘ফাজিল’, দরুল উলুম থেকে ‘কামিল হাদিস’, ওয়াজেদিয়া আলীয়া থেকে ‘ফিকাহ্’ শাস্ত্রের উপর গভীর পাণ্ডিত্য অর্জন করেন।
শরিয়তের জাহেরী জ্ঞান অর্জনের পর জ্ঞানবিজ্ঞানের সূতিকাগার কলকাতা আলীয়া ও মুসলিম আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র উপমহাদেশের আলোড়িত আলেমদ্বীন স্বীয়পিতা শামসুল ওলামা হযরত কাজী সিরাজুল মোস্তফা (রা.) থেকে তরিকতের সুধা পান করে আল্লাহ ও রাসুলের অনুগ্রহে হাকিকত ও মারেফতের উচ্চ মকামে অধিষ্ঠিত হন।
মুনিরীয়া তরিকতের এই উজ্জ্বল নক্ষত্র তরিকতের দায়িত্ব পালনকালে সাধারণ মানুষ ওজিফা নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করলে তিনি পাঁচ ওয়াক্ত নামায আদায় এবং মা-বাবার খেদমত করতে বলতেন। আর যদি মা-বাবা বেঁচে নাই বললে তখন তাকে ভালোভাবে শরিয়ত অনুসরণের কথা বলতেন। তারপরও যদি কেউ ওজিফা চাইতেন তখন তিনি আরও হালাল খাবার উপদেশ দিতেন। অনেকে ইসলামের এই মূল আদর্শ অনুসরণ করতে না পেরে হুজুরের নিকট থেকে ওজিফা না নিয়ে চলে যেতেন। কিন্তু যারা কষ্ট করে হুজুরের পিছনে লেগে থাকতেন তিনি তাদেরকে প্রথমে ওজিফা পরে শরীরের কোন অংশের সাথে কোরআনের কোন আয়াতের কি সম্পর্ক ইত্যাদি হাতে ধরে ধরে বিশেষ আলোচনা করে বুঝায়ে দিয়ে (কলব কোথায় অন্য লতিফাগুলো কোথায়) প্রথম ছবক দিয়ে হুজুর তরিকতের উর্বর চারণ ভূমি তৈয়ার করতেন। তিনি সাত তরিকীর খেলাফত প্রাপ্ত ছিলেন। তিনি তরিকতের মাশায়েখ হিসেবে যখন তখন বাইয়াত করাতেন না। গাউসে পাকের আশেক হিসেবে কাদেরীয়া তরিকায় বাইয়াত করাতেন। তিনি ২০০৮ সালে সর্বশেষ দরবারের মসজিদে বাইয়াত করান।
তিনি সরাসরি রাজনীতি না করলেও সুন্নিয়তভিত্তিক ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠায় ইসলামী ফ্রন্ট ও ছাত্রসেনাকে সহযোগিতা করতেন নীরবে। হুজুর রাজনৈতিকভাবে খুবই সচেতন ছিলেন। রাজনীতির খবরাখবর নিতেন। তিনি স্থানীয় ও জাতীয় একাধিক পত্রিকা ও তার উপসম্পাদকীয় পাঠ করতেন। তিনি বিশেষভাবে লেখকদেরকে মূল্যায়ন করতেন। আমাকে যখন গবেষণার জন্য “চট্টগ্রাম ইতিহাস চর্চা কেন্দ্র” থেকে সম্মাননা দিয়ে সম্মানিত করেন, সে সম্মাননা নিয়ে হুজুর কেবলাকে দিলে তিনি বিস্তারিত জিজ্ঞেস করে নিজ হাতে আবার ঐ (উত্তরীয়) পরিয়ে দিয়ে বলে, আমিও তোমাকে পরিয়ে দিলাম। দোয়া করি যাতে বড় লেখক হতে পার।
জ্ঞানপিপাসু এই মহান সাধক শিক্ষা বিস্তারে ফেরীওয়ালা হয়ে পৃষ্ঠপোষকতার দায়িত্ব পালন করেছেন নীরবে। তিনি মাদ্রাসা শিক্ষার পাশাপাশি স্কুলেও করেছেন পৃষ্ঠপোষকতা। যাহা ওফাতের পরে শতকোটি আলোকবর্ষ দূরে নীহারিকার মতো মানব সমাজের সামনে আসে।
মুসলিম বিবাহের (রেজিস্ট্রেশন) কাজী সাহেবদের একত্রিতকরণে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। সততা ও নিষ্ঠার সাথে কাজীর কাজ পরিচালনার জন্য সরকার দেশের শ্রেষ্ঠ কাজী হিসেবে পুরস্কৃত করেন।
আমদানী রপ্তানি ব্যবসার সাথে জড়িত থাকলেও তিনি আমদানি নির্ভর দুগ্ধখাতকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে প্রতিষ্ঠা করেন গরুর খামার। যা ২০০৪ সালে দেশের শ্রেষ্ঠ খামারীর পুরস্কার পায়। গত জোট সরকারের কৃষিমন্ত্রী এম কে আনোয়ার দেশের দুগ্ধ খাতকে এগিয়ে নেওয়া অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য পরিদর্শন করেন হুজুরের খামার।
বহু প্রতিভাবান এই ফানাফির রাসুল (দ.) থেকে তরিকতের দায়িত্ব পালনকালে অসংখ্য কারামত প্রকাশ পায়। ’৯৭ সালের এক সকালে আমার এক নিকট আত্মীয়কে নিয়ে দরবারে উপস্থিত হই। হুজুর তখন ক্ষেতে কাজ করছিলেন।ক্ষেত থেকে এসে উপস্থিত মুরিদ ও অনুগামীদের বিদায় করছিলেন। এমন সময় আমি এগিয়ে কথা বললে তিনি নতুন বিল্ডিংয়ের নিচে দাঁড়াতে বলেন। কিছুক্ষণ পর এগিয়ে বললাম হুজুর ওনার হার্টের বাল্ব দুইটি নষ্ট হয়ে গেছে ভারতের ডা. শেটি বলছে বাঁচবে না। তিনি হার্ট বরাবর ধরার পর (আমার)আত্মীয়টা লাফালাফি করতে লাগল। এরপর অনেক বছর কোন ঔষধ ছাড়া স্বাভাবিক চলাফেরা করতে পারছে হুজুরের খাদেম জামিল ভাই বলেন তিনি হজ্বের সময় মদিনা শরীফের মসজিদে নববীতে জেয়ারত করার জন্য বসে আছে পুলিশ নবী করিম (দ.) রওজা মোবারকের কাছে যাইতে দিচ্ছে না। কিন্তু জামিলের ইচ্ছা তিনি রওজা মোবারকের কাছে গিয়ে জেয়ারত করার এমন সময় হুজুর জামিলের হাতের বাহু ধরে রওজা মোবারকের ভিতরে ঢুকিয়ে দিয়ে হুজুরে আকরাম(দ.) এর সাথে দীদার করিয়ে দেন। (সুবহান্নালা)।
একদিন হুজুর ট্রাকে করে খামারে ইট নিয়ে যাচ্ছেন। খামারের কাছাকাছি গেলে দেখা যায় ব্রিজ ভাঙা। ড্রাইভার ছিলেন হুজুরের মুরিদ। তিনি চালককে বলেন, তুমি গিয়ে ব্রিজের নিচে দাঁড়াও আমি গাড়িটা চালিয়ে নিয়ে যাই। ড্রাইভার নিচে দাঁড়ালে তিনি গাড়িটা চালাইয়ে নিয়ে যান।
চট্টগ্রামে সুনামী ও ঘূর্ণিঝড়ের সংকেত দেওয়া হলে সরকার উপকূলীয় এলাকা থেকে জানমাল রক্ষার জন্য মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে পুলিশের পাশাপাশি অন্য স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ করে। কক্সবাজারের দায়িত্বপ্রাপ্ত এক স্বেচ্ছাসেবক কর্মকর্তা সৈকতে দাঁড়ানো এক হুজুরকে দেখেন হাত দিয়ে আকাশের মেঘগুলো সরিয়ে দিচ্ছে। এইটা দেখে হুজুরের সাথে কথা বলতে চাইলে, তিনি কোন কথা না বলে চলে আসেন। কিন্তু ঐ কর্মকর্তা কোনভাবে এই কথা ভুলেনি। একদিন চট্টগ্রাম শহরে হুজুরকে ঐ কর্মকর্তার দৃষ্টিগোচর হলে তিনি হুজুরের গাড়ি অনুসরণ করে, দরবারে চলে আসলে তখন ঘটনা প্রকাশ পায়।
হুজুরের অন্যতম কেরামত আমার ছেলের জন্ম। আমার স্ত্রী কনসিভ করার আগে ডা. শাহানারা বলেন, তার কাছে অসংখ্য টিউমার, যা অপারেশন ছাড়া কোন পথ নাই। আমার স্ত্রীকে নিয়ে হুজুরের কাছে গেলে তিনি দোয়া করে বলেন, ভালো হয়ে যাবে। আল্লাহর বিশেষ রহমত আমার স্ত্রী ভাল হয়ে যায়। এবং কনসিভ করে। বাচ্চার জন্মের ১৫ দিন আগে আমার স্ত্রীকে স্বপ্নে বলেন, দাঁড়া তোর জন্য লওহে মাহাফুজ হতে একটি জিনিস এনেছি। তিনি কাজী সাহেব হুজুরের মাজারের সামনে একটি ছেলে এনে আমার স্ত্রীর হাতে দিয়ে বলে তোমার জন্য রাখা ছেলেটি নাও। তাহার সাথে কথা বলতে চাইলে সময় নাই বলে দ্রুত পশ্চিম দিকে চলে যায়। ডা. তাহেরা তার মেধা ও মনন দিয়ে জন্মের আগ পর্যন্ত পরিচর্যা করেন। শেভরন ও ইপিকের রিপোর্টে আসে মেয়ে হবে হুজুর বলেন ছেলে হবে হুজুরের দোয়ায় আল্লাহ আমাকে ছেলে দান করেছেন।
এই আওলাদে রাসুলের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে ছোবহানিয়া আলী মাদ্রাসার উপাধ্যক্ষ হযরত জুলফিকার আলী (ম.আ.) বলেন, উপমহাদেশের প্রখ্যাত মোহাদ্দেস হযরত ইউনুস সাহেব(র.) সাথে হালিশহর দরবার শরীফে যান শুক্রবার। মোহাদ্দেস সাহেব (র.) হুজুরের ওস্তাদ, আর হুজুর ছিলেন মোহাদ্দেস সাহেব (র.) পীর। মোহাদ্দেস সাহেব হুজুরের (ছাত্রের) সামনে বসে তরিকতের ছবক নিলেন। অর্থাৎ ইউনুস সাহেব প্রখ্যাত মোহাদ্দেস হলেও তরিকতের জগতে আপন ছাত্র উজ্জ্বল নক্ষত্র হওয়ায় পীর হিসেবে গ্রহণ করে জগতবাসীর সম্মুখে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। হুজুর মোহাদ্দেস সাহেবকে নিজের অন্দরমহলে নিয়ে আথিতেয়তা করেন। আর মোহাদ্দেস সাহেবকে বলেন হুজুর আপনি আমাদেরকে কিতাব পড়ায়াছেন। এইগুলো এখনো আমার মুখস্থ আছে বলব বলব বলে এক নিমিষে দুই পৃষ্ঠার মতো বলে ফেলেন। আসার সময় গাড়িভাড়ার জন্য মোহাদ্দেস সাহেবকে হাদিয়া দেন।
শরিয়ত বান্ধব এই দরবারের পীর ছিলেন গরীব মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল। তিনি মানুষদেরকে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত দর্শন দিয়ে মানুষের সমস্যা সমাধানে হাত বাড়িয়ে দিতেন। কখনো তিনি আগত মানুষদেরকে দরবারে গরু ছাগল বা টাকা পয়সা মানতের জন্য বলতে শোনা যায় নি। বরং কেউ পাঁচশত টাকা দিলে তিনি জিজ্ঞাসা করতেন এইগুলো কিসের টাকা। তিনি সকলের (যাদের টাকা বৈধ নয়) টাকা নিতেন না।
এক লোক এসে হুজুরকে এক লক্ষ টাকা দিলে হুজুর রাগান্বিত হয়ে বলেন, মৌলানা জালাল সুদ খায় না বলে টাকাগুলো ফেরত দেন। আগত লোক টাকাগুলো নিয়ে চলে গেলে হুজুর বলেন, একটি ব্যবসায় লাভ হলে ঐ খান থেকে এক লক্ষ টাকা দেওয়া মান্নত করে কিন্তু সে লাভের টাকা দিয়ে সুদের ব্যবসা করে ঐ থেকে এক লক্ষ টাকা আমার জন্য আনে।
হুজুর দরবার সমূহের উপর বাতিলদের আনিত অভিযোগের কালিমাযুক্ত কাফনের নেকাব উপড়ে ফেলে ইসলামী শরীয়তের উপর দরবার পরিচালনা করেছেন। তিনি নিজ কোষাগার থেকে প্রতিদিন দরবারে আগত শত শত মানুষকে তাবলিগ মঞ্জিলে খাওয়ার ব্যবস্থা করতেন। শুক্রবার হাজার হাজার লোক জুমার নামাজ পড়ে খেতেন।
এই মাহাবুবে রাব্বানি নিজের ওফাত সম্পর্কে আগে অবগত থাকা নির্দশন রেখে যান এইভাবে। হুজুরের বাড়ীর উত্তর পার্শ্বে নিজের কৃষিজমিতে প্রতি বছর শীতকালে সবজি তে করতো। এই বছর ক্ষেতের সময় আসলে হুজুরে অনুমতি চাওয়া হলে তিনি বলেন, এই বছর জমিটি তার লাগবে। দেখা গেল হুজুরের ওফাতের পর সমস্ত অনুষ্ঠান হয় ঐ জমিতে।
হুজুর অসুস্থ হওয়ার আগে খেলাফতের উত্তরাধিকারী আদরের দৌহিত্র বর্তমান পীর সাহেব কেবলার একমাত্র সাহেবজাদা মোস্তফাকে হুজুর ডেকে বলেন, যাও পশ্চিমের বেড়ি বাঁধটির কাজ শেষ হয়েছে কিনা দেখে আস। কারণ তিনি জানতেন তাহার জানাজায় এত মানুষ হবে সাগরের পাড় ছাড়া চট্টগ্রামে কোন স্থান নাই। বাস্তবে তা হল সাগর পাড়ের পাঁচ কিলোমিটার এলাকা লোকে লোকারণ্য হয়ে গেল। তাহার কথাগুলো দ্বারা কেউ বুঝতে পারেনি, তিনি চলে যাওয়ার জন্য এত আয়োজন। উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়া হলে ওফাতের আগে সবার সাথে কথা বলেন, আর সবাইকে কলেমা পড়তে বলেন। তিনিও কলেমা শরিফ পাঠ করতে করতে ১৫ জানুয়ারী ২০১৯ ইং ৪ টা ২৫ মিনিটে ৮২ বছর বয়সে আল্লাহর দীদার লাভে ধন্য হন। ইনল্লিলাহি….। তিনি হজ্বব্রত পালন, আরব আমিরাত, ভারতসহ ইসলাম ও তরিক্বতের প্রচারের লক্ষ্যে বহু দেশ ভ্রমণ করেন।
তিনি স্ত্রী, ৫ ছেলে, ৩ মেয়ে, লক্ষ লক্ষ মুরিদানকে শোক সাগরে ভাসিয়ে চলে যান না ফেরার দেশে।
তাহার ওফাতের খবর দ্রুতবেগে ছড়িয়ে পড়লে নেমে আসে শোকের ছায়া।
এই সদরুশ শরীয়তের নিথর দেহ মোবারকটি যখন হালিশহর দরবার শরীফে আনা হয় লক্ষ লক্ষ ভক্ত মুরিদানকে অশ্রু সজল নয়নে একনজর দেখতে নির্ঘুম রাত কাটান, আর কুরআন মজিদ তেলাওয়াতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। ইতিহাসে শ্রেষ্ঠ জানাজাটি দেখে মানুষ ব্যাকুল হয়ে উঠে। জানাজায় চট্টগ্রামের সর্বস্তরের মানুষ ছাড়াও রাজনৈতিক, ব্যবসায়ী নেতাদের পাশাপাশি বিভিন্ন দরবারের গদীনশীনগণ অংশগ্রহণ করেন। অন্তধানের বছর পরে রাব্বুল আলামীনের দরবারে আকুতি পরকালীন জগতে তাঁকে উচ্চ মকামে আধিষ্ঠ্য করে সম্মানি করুণ।

লেখক: গবেষক ও প্রাবন্ধিক



ফেইসবুকে আমরা