বাংলাদেশ, , রোববার, ২৬ জুন ২০২২

পৃথিবী রক্ষায় পরিবেশ দূষণ সম্পর্কে মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে : এ কে এম আবু ইউসুফ

  প্রকাশ : ২০২২-০৬-০৬ ১৭:১০:৫৮  

পরিস্থিতি২৪ডটকম :  আগামীকাল বিশ্ব পরিবেশ দিবস। সারা পৃথিবীজুড়ে ৫ জুন এই বিশ্ব পরিবেশ দিবস বা World Environment Day পালিত হয়। মানুষ আর পরিবেশের দূরত্ব ঘুচিয়ে এক সবুজ নির্মল পৃথিবীর স্বপ্ন বাস্তবায়নে দিবসটিকে গুরুত্বের সঙ্গে পালন করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ। বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালনের পিছনে যে উদ্দেশ্য কাজ করে, তা হল পরিবেশ সম্পর্কে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। বিশ্ব পরিবেশ দিবস সর্বপ্রথম ১৯৭২ সালে জাতিসংঘ দ্বারা পালিত হয়। এই দিবসটি উদযাপনের প্রধান কারণ হ’ল পরিবেশ সম্পর্কে মানুষের সচেতনতা বাড়ানো। মানুষও পরিবেশ এবং পৃথিবীর অঙ্গ। প্রকৃতি ছাড়া মানুষের জীবন অসম্ভব। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের অঙ্গাঙ্গী সম্পর্কের কথাটা জানা খুবই জরুরি। প্রতি বছর, বিশ্ব পরিবেশ দিবসের একটি থিম বা প্রতিপাদ্য বিষয় থাকে।এবারের (২০২২ সালের) বিশ্ব পরিবেশ দিবসের প্রতিপাদ্য হল পৃথিবী একটাই, তোমার,আমার, সকলের। এর লক্ষ্য কীভাবে পৃথিবীর বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের বিকাশ করা যায়, সেই রূপ কাঠামো গঠন। বিশ্বব্যাপী দেশগুলিতে বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে সরকারী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ ও তার ব্যাতিক্রম নয়।বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালনের মূল কারণ হল পরিবেশ সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা।

আমাদের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন পরিবেশ প্রকৃতি। কিন্তু প্রতিনিয়ত এ পরিবেশকে আমরা নানাভাবে দূষিত করে আসছি। বিশ^জুড়ে এখন পরিবেশ দূষণের মাত্রা ভয়াবহ। পরিবেশ দূষণের উল্লেখযোগ্য কারণের মধ্যে রয়েছেঃ-

অত্যধিক হারে জনসংখ্যা বৃদ্ধি,অপরিকল্পিত নগরায়ণ,নির্বিচারে বৃক্ষনিধন ও বনভূমি উজাড়,সার ও কীটনাশকের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার,শিল্প কলকারখানার বর্জ্য,গাড়ির বিষাক্ত ধোঁয়া,ওজোন স্তরের ক্ষয়,অ্যাসিড বৃষ্টি,অপরিকল্পিত গৃহনির্মাণ,দারিদ্র্য,প্রসাধন সামগ্রী,প্লাস্টিক দ্রব্যের ব্যবহার ইত্যাদি।

মানুষ একদিন প্রকৃতিকে জয় করার নেশায় মত্ত হয়েছিল। প্রকৃতিকে জয় করেও মানুষের সেই নেশার অবসান হলো না। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির কল্যাণে মানুষ জলে, স্থলে, মহাশূন্যে আধিপত্য বিস্তার শুরু করল। কিন্তু মানুষের এই বিজয় মানুষকে এক পরাজয়ের মধ্যে ফেলে দিল। আজ আমরা এক ভয়ংকর সংকটের মুখোমুখি। এ সংকট বিশেষ কোনো দেশের নয়, বিশেষ কোনো জাতির নয়। এ সংকট আজ বিশ্বজুড়ে। বিশ্বের পরিবেশ আজ নানাভাবে দূষিত। এই দূষণ আজ ভয়ংকর ভবিষ্যতের দিকে আমাদের নিয়ে যাচ্ছে। ভয়াবহ পরিবেশ দূষণের কবলে পড়ে আজ বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ শঙ্কার মধ্যে রয়েছে। অপেক্ষা করছে এক মহাধ্বংস! আজ জলে বিষ, বাতাসে আতঙ্ক, মাটিতে মহাত্রাস। গত ৬০ বছরের ৮০টির বেশি প্রজাতির প্রাণী নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। কয়েক’শ প্রজাতির গাছপালা বিলুপ্ত।আমাদের অর্থনৈতিক উন্নতি হয়েছে। এ পরিণামে বাতাসে প্রতিবছর ২২ কোটি টন কার্বন মনোক্সাইড সঞ্চিত হচ্ছে। বায়ুমন্ডলে কার্বন ডাই অক্সাইড, সালফার ডাই অক্সাইড, নাইট্রাস অক্সাইড গ্যাসের আনুপাতিক হার ক্রমেই বাড়ছে এর ফলে বৃষ্টির জলে এসিডের পরিমাণ বেশি হচ্ছে। এই অ্যাসিড বর্ষণ অরণ্যে মহামারির সৃষ্টি করছে। খাদ্যশস্যকে বিষাক্ত করেছে। দ্রুতগতিতে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে সবুজ অরণ্য। সারা বিশ্বে বর্তমান ৮০ শতাংশ হলো গ্রীষ্মম-লীয় অরণ্য, এর মধ্যে প্রতি মিনিটে ২১ হেক্টর কৃষিযোগ্য জমি বন্যা হয়ে গেছে। প্রতিবছর ৭৫ লাখ হেক্টর জমি মরুভূমি হয়ে যাচ্ছে। প্রতি মিনিটে ৫০ হেক্টর উর্বর জমি বালুকাকীর্ণ হয়ে যাচ্ছে। প্রতিবছর বাতাসে বিপুল পরিমাণ অক্সিজেন কমছে। বিজ্ঞানের অপব্যবহারে

ভূপ্রকৃতির ওপরে অত্যাচার বাড়ছেই। শস্য রক্ষার জন্য নানা ধরনের কীটনাশক তৈরি ও প্রয়োগ হচ্ছে। এসব বিপজ্জনক রাসায়নিক দ্রব্যের অনুপ্রবেশ ঘটছে মানুষের শরীরে। ফলে নানা জটিল ও কঠিন রোগের দানা বাঁধছে আমাদের শরীরে।

পরিবেশ দূষণের জন্য পৃথিবীতে ৮০ শতাংশ নিত্য নতুন রোগের সৃষ্টি হচ্ছে। পরিবেশ দূষণের ফলে মেরু অঞ্চলের বরফ গলে পানিতে পরিণত হচ্ছে। বায়ুমণ্ডলের ওজোন স্তরের আয়তন ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। ফলে সূর্যের মারাত্মক অতিবেগুনি রশ্মি প্রাণিজগৎকে স্পর্শ করবে। দূষণের ফলে উদ্ভিদ ও জীব জগৎ আজ বিপন্ন, সমুদ্রে-নদীতে-জলাশয়ে মাছের সংখ্যা দিন দিন কমছে। মাছের শরীরে নানা রোগ দেখা দিচ্ছে।

বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দূষণ ও পরিবেশগত ঝুঁকির কারণে যেসব দেশ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত তার একটি বাংলাদেশ। বাংলাদেশে প্রতিবছর যত মানুষের মৃত্যু হয়, তার ২৮ শতাংশই মারা যায় পরিবেশ দূষণজনিত রোগব্যাধির কারণে। কিন্তু সারা বিশ্বে এ ধরনের মৃত্যুর গড় হার মাত্র ১৬ শতাংশ। বর্তমানে

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার যুগোপযোগী ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেতৃত্বে বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার পরিবেশ সংরক্ষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত কার্যকরভাবে মোকাবেলায় বেশকিছু যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে এবং সেগুলোর সুষ্ঠু বাস্তবায়নে আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে। পরিবেশ সংরক্ষণকে অধিকতর গুরুত্ব প্রদানপূর্বক বাংলাদেশের সংবিধানে পরিবেশ বিষয়ে একটি পৃথক অনুচ্ছেদ সংযোজন করে সুস্থ পরিবেশকে মানুষের সাংবিধানিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করেছে।

এছাড়া, বিশ্ব উষ্ণায়নজনিত জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ অভিঘাতের সাথে খাপ খাওয়ানো বা অভিযোজন এবং প্রশমন বা কার্বন নিঃসরণ হ্রাস- এ দুই খাতেই বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন পর্যায়ে নানাবিধ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। সম্প্রতি সরকার জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও টেকসই আহরণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ জীববৈচিত্র্য আইন ২০১৭ জারি করেছে। সরকার দেশের জীববৈচিত্র্য সমৃদ্ধ কিছু এলাকার প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ ও টেকসই ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ইতোমধ্যে ৩৮টি বনসম্পদ ও জীববৈচিত্র্য সমৃদ্ধ এলাকাকে ‘সংরক্ষিত এলাকা’ বলে ঘোষণা করা হয়েছে।

বৈশ্বিক উষ্ণতা, পানি ও বায়ুদূষণ এবং জীববৈচিত্র্য ও মাটির ওপর বিরূপ প্রভাবে পরিবেশের গুণগতমানের অবনতির কারণে মারা যাচ্ছে হাজারো মানুষ। আমরা যদি সঠিক পরিকল্পনা নিয়ে এর প্রতিকার না করি, তাহলে এর ফল হবে ভয়াবহ। ধ্বংস হবে প্রাকৃতিক সম্পদ, বাড়বে অভিবাসন এবং সেই সঙ্গে বাড়বে সংঘাত।

এসব কিছু রক্ষা করার জন্য এপ্রিল ২৯, ২০২০ ইং তারিখে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তেনিও গুতেরেস বিশ্বনেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, করোনা পরিস্থিতি থেকে শিক্ষা নিয়ে পৃথিবীকে আরও বাসযোগ্য করে তুলতে হবে। আন্তর্জাতিক জলবায়ু সম্মেলনে ভিডিও কনফারেন্সে দেয়া এক বক্তব্যে এ আহ্বান জানান তিনি।

এ সময় তিনি আরো বলেন, এই সংকট মোকাবেলায় প্রয়োজন সাহসী ও সহযোগিতামূলক নেতৃত্ব। শ্রেষ্ঠতর পৃথিবী গড়তে বিরল এক সুযোগ পেয়েছেন বিশ্ব নেতারা। একইসঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৈশ্বিক হুমকি মোকাবেলায় তাদের একসঙ্গে কাজ করার আহ্বানও জানান। এছাড়া মহামারী থেকে বিশ্বকে রক্ষা করতে হলে মানুষের নিরাপদ, স্বাস্থ্যসম্মত ও সহিষ্ণু পৃথিবী গড়ে তোলারও আহ্বান জানান জাতিসংঘ মহাসচিব।

জাতিসংঘ মহাসচিবের এ আহ্বানে বাংলাদেশও সাড়া দেবে। কারণ বিশ্বকে বসবাসযোগ্য করার লক্ষ্যে দূষণমুক্ত বিশ্ব গড়ার অঙ্গীকার নিয়ে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। জীববৈচিত্র্যে ভরপুর আমাদের বাংলাদেশ। তবে মানুষের সচেতনতার অভাবে আজ তা অরক্ষিত। নানা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে পৃথিবী ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। পরিবেশ দূষণের ভয়াবহতা থেকে মানুষকে বাঁচাতে হবে।কেননা আমাদের প্রকৃতি আমাদের যে সমস্ত সুবিধা দেয়, বিনিময়ে আমরা তার সিকিভাগ উপকারও স্বীকার করি না, ভালো থাকতে দিই না তার বেড়ে উঠায় ব্যাঘাত ঘটিয়ে। জাতিসংঘ বলছে, প্রকৃতি আর মানুষের সম্পর্কের এই টানাপোড়েন মেটাতে পরিবেশ দিবস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সে ভাবনা থেকেই সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে প্রতি বছর পরিবেশ দিবসের জন্য নির্দিষ্ট একটি বিষয়কে ঠিক করা হয়। দেড়শো’রও বেশি দেশে নানান আয়োজন থাকে এই দিনটিতে। জাতিসংঘ বলেছে, সাতটি ক্ষেত্রে পরিবেশ নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। তা হলে পরিবেশ দিবসের সঠিক উদ্যাপন হতে পারে। যেমন: (ক) আমরা ব্যক্তিগতভাবে কী কিনছি, কীভাবে ব্যবহার করছি সেটা আরও একবার ভাবা; (খ) ব্যক্তিগত খাতে পরিবেশগতভাবে টেকসই ব্যবসায়ী মডেল কাজে লাগানোর জোর দেওয়া; (গ) কৃষিক্ষেত্রে প্রকৃতির ক্ষতি না করে উৎপাদন সমৃদ্ধ করা; (ঘ) গণখাতে সরবরাহ চেইন ও অর্থায়নে পরিবেশগত দিকটি বিবেচনায় রাখা; (ঙ) সরকারিভাবে বন্যপ্রাণী ও তাদের আবাসস্থল নিরাপদ করে তোলায় সচেষ্ট হওয়া; (চ) তরুণদের এক সবুজ ভবিষ্যতের স্বপ্ন বাস্তবায়নে নিজেদের মূল ভূমিকায় রাখা; (ছ) সংগ্রাহক হিসেবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় প্রকৃতিকে কেন্দ্রবিন্দুতে রাখা। জাতিসংঘ প্রেরিত এই নীতিমালা বাস্তবায়িত হলেই জীববৈচিত্র্য রক্ষাসহ পরিবেশ রক্ষা পাবে (তথ্যসূত্র: ইন্টারনেট ও সাময়িকী)। শুধুমাত্র বিশ্ব পরিবেশ দিবসের এই দিনটিতে পরিবেশ রক্ষার সচেতনতায় ভূমিকা রেখে বাকি দিনগুলো পরিবেশকে ভুলে থেকে দূষণ নামের ভয়াবহতার মাধ্যমে পৃথিবীকে অসুস্থ করে তুলে পরবর্তী প্রজন্মকে হুমকির মুখে ফেলে দেওয়ার আগে একবার ভাবুন, আমরা মানুষরাই নিজেদের স্বার্থ হাসিল করার জন্যই পরিবেশকে বিপন্ন করছি, দূষণ করছি সুন্দর এই পরিবেশকে। যার কারণে প্রকৃতি ভিন্নভাবে প্রতিশোধ নিচ্ছে আমাদের থেকে। সুতরাং আসুন এই দিনের গুরুত্ব ছড়িয়ে দিই বছরজুড়ে। তবেই সার্থকতা পাবে পরিবেশ দিবসের, রক্ষা পাবে আমাদের এই সুন্দর পরিবেশ, রচিত হবে আগামী প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য পৃথিবী।

লেখক: কলামিস্ট, পরিবেশবিদ ও প্রতিষ্টাতা চেয়ারম্যান : বাংলাদেশ পরিবেশ উন্নয়ন সোসাইটি (বাপউস)



ফেইসবুকে আমরা