বাংলাদেশ, , শনিবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

শিরোনাম

সুলতানুল আউলিয়া সুফিসম্রাট অছি-এ-গাউসুল আজম হযরত সৈয়দ দেলাওর হোসাইন মাইজভাণ্ডারী (র.): লায়ন ডাঃ বরুণ কুমার আচার্য বলাই

  প্রকাশ : ২০১৯-০১-১৫ ১৬:৩২:৫৮  

পরিস্হিতি২৪ডটকম : হযরত সৈয়দ দেলাওর হোসাইন মাইজভাণ্ডারী (ক.) ১৮৯৩ সনে এই ধরাধামে তশরিফ আনেন। পিতা সৈয়দ ফয়জুল হক মাইজভাণ্ডারী। পিতামহ হযরত গাউসুল আজম মাওলানা সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভাণ্ডারী (ক.), যিনি উপমহাদেশে সুপ্রসিদ্ধ ও বাংলার জমিনে প্রতিষ্ঠিত একমাত্র তরিকা-তরিকায়ে মাইজভাণ্ডারীয়া’র প্রতিষ্ঠাতা। চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির অজপাড়া গ্রাম মাইজভাণ্ডারকে পবিত্রতার পরশে ধন্য করে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলকে ধর্মীয় অনুশীলনের দ্বারা ‘উসূলে সাব-আ’ বা ‘সপ্ত পদ্ধতি’র যথাযথ চর্চার মাধ্যমে মর্মে ও কর্মে উদ্বুদ্ধ করে তিনি একটি সহজসাধ্য জাগতিক ও আধ্যাত্মিক মুক্তির পথ দেখিয়ে “গাউসুল আজম” উপাধিতে ভূষিত হন।
যার তথ্য শায়খুল আকবর হযরত আল্লামা মুহীউদ্দীন ইবনুল আরবি (ক.) রচিত বিশ্ববিখ্যাত ‘ফছুছুল হেকম’ গ্রন্থের ফচ্ছে শীচ অধ্যায়ে বর্ণিত আছে। এই গ্রন্থে বেলায়তে ওজমা বা শ্রেষ্ঠ বেলায়তের সর্বশেষ ধারক তথা ‘খাতেমুল অলদ’ বা ‘খাতেমুল আউলিয়া’র পরিচয়, মর্যাদা ও তাঁর আবির্ভাবের পূর্বাভাষ বিশদভাবে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। হযরত মুহীউদ্দীন ইবনুল আরবি (রহ.) এর পীর গাউছুল আজম শেখ সৈয়দ মহিউদ্দিন আবদুল কাদের জিলানী (ক.) এর বিশেষ ফয়েজপ্রাপ্ত খলিফা ও রুহানী সন্তান ছিলেন। বড়পীর সাহেব কেবলা (ক.) স্বীয় নামীয় উপাধি ‘মুহীউদ্দীন’ তাঁর নামের সাথে সংযুক্ত করে তাঁকে স্বীকৃতি প্রদান করেন। আরো উল্লেখ আছে ৬৩৭ হিজরি সনে তিনি রাসুলে আকরাম (দ.) কর্তৃক স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে ‘ফছুছুল হেকম’ নামক উক্ত মহা মূল্যবান গ্রন্থটি রচনা করেন। তিনি ৬৩৮ হিজরি সনে ওফাতপ্রাপ্ত হন।
হযরত শায়খুল আকবর তাঁর অপর প্রসিদ্ধ গ্রন্থ ‘ফতুহাতে মক্কিয়া’য় উল্লেখ করেন যে, রাসুলুল্লাহ (দ.) এর শ্রেষ্ঠ বেরাছতী বা উত্তরাধিকারিত্ব হল খাতেমুল বেলায়ত। হযরত মাওলানা তোরাব আলী কলন্দর (রহ.) কর্তৃক ফারসি ভাষায় রচিত প্রসিদ্ধ ‘মতালেবে রশীদী’ গ্রন্থেও গাউছুল আজমে এখতেতামিয়া (শেষ গাউছুল আজম) এর আধ্যাত্মিক মর্যাদার বর্ণনা পাওয়া যায়।
গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারী বিশ্ব ত্রাণ কর্তৃত্বের দাবি নিয়ে খোদার হুকুমে বিল আছালত শানের অলীউল্লাহ হিসেবে আবির্ভূত হন। তিনি ‘ফরদুল আফরাদ’ ও আহমদ মোস্তফা (দ.) এর সমস্ত বেলায়তী গুণের অধিকারী এবং সূক্ষ্মত্ব স্থূলত্বের সমাবেশকারী। তাঁর উপরে অধিক কোনো মর্তবা নেই। তিনি সামাজিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় প্রোপটে বিপর্যস্ত বিশ্বমানবতার পুনরুদ্ধারকল্পে বেলায়তে মোতলাকার মশাল হাতে রাসুলে করিম (দ.) এর বেলায়তের তাজ শির মোবারকে পরে স্বমহিমায় আবির্ভূত হন। লেওয়া-এ-আহমদীর ঝাণ্ডাধারী বেলায়তে মোকাইয়্যাদা যুগের পরিসমাপ্তিকারী ও বেলায়তে মোতলাকা-এ আহমদীর প্রবর্তক, তৌহিদে আদয়্যানের সমর্থক, আওলাদে রাসুল (দ.) খাতেমুল অলদ, গাউছুল আজম-এ এখতে তামিয়া (পরিসমাপ্তিকারী) হলেন হযরত মাওলানা শাহসুফি সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভাণ্ডারী (ক.)।
বিভক্ত ও বিুব্ধ এই বৈশ্বিক প্রোপটে বিশ্বসুফি সভ্যতার ধারাবাহিকতায় এক ঐতিহাসিক যুগোপযোগী ধারণা ‘মাইজভাণ্ডারী তরিকা’। উপমহাদেশের প্রসিদ্ধ অধ্যাত্ম মিলনকেন্দ্র মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফের অধ্যাত্ম শরাফতের গোড়াপত্তনকারী মাইজভাণ্ডারী তরিকার মহান প্রবর্তক খাতেমুল অলদ, অলিকুল সম্রাট গাউছুল আজম হযরত মাওলানা শাহসুফি সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভাণ্ডারী (ক.) এর ‘বেলায়তে মোতলাকা’ (উন্মুক্ত ঐশী প্রেমবাদ)’র উদাত্ত আহবান আজ এই উপমহাদেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে সমগ্র বিশ্বের সত্যান্বেষী মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণে সমর্থ হয়েছে। যার ফলে ‘মাইজভাণ্ডার’ নামক ছোট্ট গ্রামটি কালের পরিক্রমায় আজ পরিণত হয়েছে আত্মিক শুদ্ধি ও আত্মশুদ্ধি প্রত্যাশী দেশবিদেশের ল ল মানুষের এক মহা সম্মিলন কেন্দ্রে।
গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারী (ক.) এর সমস্ত পবিত্র রাজ রহস্যের সুযোগ্য ধারক ও বাহক হলেন প্রকাশক ও বিকাশক অছি-এ-গাউসুল আজম সৈয়দ দেলাওর হোসাইন মাইজভাণ্ডারী (র.)।
গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারী (ক.) স্বয়ং তাঁর এই প্রিয় পৌত্রের নামকরণ করেন। ‘দেলাওর’ অর্থ সেনাপতি। হোসাইন অর্থ অতি উত্তম। মাত্র ৯ বছর বয়সে পিতৃবিয়োগ এবং ১৩ বছর বয়সে প্রিয় মুনিব দাদাজান গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারী (ক.)’র তিরোধানে একমাত্র বংশীয় ওয়ারিশ হিসেবে জাগতিক এবং আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকারের এক সুকঠিন জিম্মাদারিত্ব কিশোর সৈয়দ দেলাওর হোসাইন মাইজভাণ্ডারীর স্কন্ধে অর্পিত হয়। প্রিয় মুর্শিদ দাদাজান কেবলার ‘উত্তম সেনাপতি’ হিসেবে তাঁর নামকরণ যেন রহস্যময় বিধাতার অমোঘ অথচ এক দূরদর্শী বিধান।
গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারী (ক.) কর্তৃক তিনি দেলাময়না ও সুলতান বা নবাব ঘোষণার পরও বিখ্যাত আলেম-উলামা-গবেষকদের লেখনি তাঁকে আয়নায়ে গাউছুল আজম, ময়নায়ে গাউছুল আজম, রুহে গাউসুল আজম, নবাবে গাউসুল আজম, লখতে জিগরে গাউসুল আজম, খাদেমুল ফোকরা, অছি-এ-গাউসুল আজম, বাব-এ-গাউছিয়াসহ বিভিন্ন নাম, উপাধিগুলো তাঁর নামের সাথে সংযুক্ত করা হয়। তবে খাদেমুলে ফোকরা ও অছি-এ-গাউসুল আজম উপাধিটি খুব বেশি প্রচারিতও প্রচলিত।
মাইজভাণ্ডার দরবারকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট সকল বিভ্রান্তি, অনাচার ও কুসংস্কারের মূলোৎপাটন এবং এই দরবারের প্রকৃত আশেক অনুসারীদের আদর্শিক বিচ্যুতি হতে রার মানসে ছোট বড় প্রায় ১২টি গ্রন্থ রচনা করে মাইজভাণ্ডারী তরিকার যথার্থ ও পরিপূর্ণ চিত্র তুলে ধরতে তিনি সমর্থ হন। বলাবাহুল্য, একাধারে তরিকার প্রবর্তক গাউসুল আজম মাইজভাণ্ডারী (ক.) এর রক্তের উত্তরাধিকারী স্নেহধন্য পৌত্র, অন্যদিকে বাল্যকাল থেকে তাঁর আদর স্নেহে লালিত পালিত এবং একান্ত সাহচার্য লাভের দুর্লভ গৌরবে গৌরবান্বিত তদীয় অছি ছিলেন এ কাজের জন্য সবচাইতে উপযুক্ত। তাঁর নিজের ভাষায় ‘আমিই এই বেলায়ত রহস্য ব্যক্ত করতে অধিকার সম্পন্ন ব্যক্তি। যেহেতু আমি অলিয়ে কামেলের অছি।’ অর্থাৎ (গাউসুল আজম মাইজভাণ্ডারীর অছি)।
মাইজভান্ডারী শরাফতের মৌলিকত্ব সুরায় আত্মবিলীনতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী সৈয়দ দেলাওর হোসাইন মাইজভাণ্ডারী ‘সুলতান’, ‘নবাব’ প্রমুখ স্বীকৃতি সত্ত্বেও তিনি ‘খাদেমুল ফোকরা’ (আল্লাহর ফকিরদের খাদেম বা সেবক) হিসেবে পরিচয় ধারণ করেন।
অন্তরে আল্লাহ তাআলার তাওহীদকে প্রতিষ্ঠা করা এবং সৃষ্টিকুলের সাহায্য ও উপকারকে উপো করা, ইহলৌকিক সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যকে পরিহার করে পারলৌকিক সুখকে প্রাধান্য দেয়া, পার্থিব দুঃখকষ্ট ভোগ করা, বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ বিশুদ্ধতা অর্জনে সাধনা করা এবং আপত্তিকর বিষয় থেকে দূরে থাকার যে মতবাদ সুফিবাদের অভ্যন্তরে রয়েছে তার সবটিই সৈয়দ দেলাওর হোসাইন মাইজভাণ্ডরী (ক.) এর মধ্যে নিহীত রয়েছে, যার প্রত্য প্রমাণ পাওয়া যায়, তাঁর মাজারকে আড়ম্বরহীন করার নির্দেশ দেয়ার মাধ্যমে। ওফাত দিবসে নেই কোন ওরশ। সংসার জীবনে নির্বিলাস জীবনযাপন করে সমাজ জীবনে মানুষের আত্মা ও জাগতিক উন্নয়নে ব্যাপক ক্রিয়াকর্ম তাঁর সমাজ ও মানুষের প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্যের মূল ল্য ও উদ্দেশ্য।
হযরত জোনায়েদ বোগদাদী (রহ.) এর মতে ‘তাসাউফ’ জ্ঞানের দুটো স্তম্ভ: (১) রবুবিয়ত বা আল্লাহর সৃজন পালন বিবর্তন সম্পর্কে উপলব্ধি করার যোগ্যতা অর্জনের জ্ঞান এবং (২) আবুদিয়ত বা দাসত্ব বরণ করার যোগ্যতা অর্জনের জ্ঞান।
আর হযরত ইমাম গাজ্জালী (রহ.) এর বর্ণনায় ‘আমি নিশ্চিতভাবে জেনেছি যে সুফিরা হচ্ছেন আল্লাহর পথের সন্ধানী। তাঁদের আচরণ হচ্ছে সর্বোৎকৃষ্ট আচরণ, তাঁদের অন্তরে আল্লাহ ছাড়া আর কারও অস্তিত্ব নেই। তাঁরা হচ্ছেন আধ্যাত্মিক জ্ঞান-নদীর স্রোতধারা।’
তাসাউফ এবং সুফিবাদের দুই দুলর্ভ গুণের অধিকারী হচ্ছেন সৈয়দ দেলাওর হোসাইন মাইজভাণ্ডারী (র.)।
আদব এবং নিজেকে আত্মবিলীনতার অনন্যসাধারণ দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী বিশ্ব মানবতার কাণ্ডারী বিশ্ব ত্রাণকর্তা হযরত গাউসুল আজম মাইজভাণ্ডারীর সুযোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে অছি-এ-গাউসুল আজম সৈয়দ দেলাওর হোসাইন মাইজভাণ্ডারী কঠোর বন্দেগী সাধনার মাধ্যমে যেরূপ ‘হক্কুল্লাহ’ (আল্লাহর হক) আদায়ে সদা সচেষ্ট ছিলেন, তেমনি ‘হক্কুল ইবাদ’ (বান্দার হক) বা সমাজ ও মানুষের প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্যকর্ম সম্পাদনে ছিলেন সদা সচেতন ও সক্রিয়। তিনি জীবনের পরতে পরতে জগতের সকল অসহায়ত্বকে হৃদয়ে প্রবলভাবে ধারন, লালন ও প্রতিপালন করে স্কুল, মাদ্রাসা, লাইব্রেরি, তরিকত সংগঠন, দুর্গত মানুষের সেবা, যোগাযোগ সড়ক, ডাকঘর, রেলস্টেশনের যাত্রী ছাউনি, এলাকায় বিদ্যুৎসহ বিভিন্ন সংস্কার কাজে অগ্র সেনানী এবং ছোটবড় ১২টি গ্রন্থ রচনা করে সামাজিক সংস্কারে গাউসুল আজম মাইজভাণ্ডারী (ক.) এর শানে আজমিয়তে আত্মবিলীনতার যে অনন্যসাধারণ দৃষ্টান্ত ও তাৎপর্যপূর্ণ দীা পরবর্তীদের জন্য রেখে গেছেন তার কারণে মাইজভাণ্ডারী শরাফতের ইতিহাসে এক অপরিহার্য সম্পূরক সত্তা হিসেবে চির জাগরুক থাকবে আবহমান কাল ধরে।
সুফিবাদ ও তাসাউফের বৈশিষ্টসম্পন্ন এই অধ্যাত্ম সাধক ২ মাঘ ১৩৮৮ বাংলা মোতাবেক ১৬ই জানুয়ারি ১৯৮২ সালে স্রষ্টার সান্নিধ্যে মিলিত হন। সমকালীন এবং আগামী প্রজন্ম তাঁকে স্মরণ করবেন তাঁর অনন্যসাধারণ অবদানের জন্য। একইসাথে মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফ তাঁকে স্মরণ করবেন এই তরিকার তাত্ত্বিক বিশ্লেষক এবং স্বরূপ উম্মোচক হিসেব

লেখক: প্রাবন্ধিক, মরমী গবেষক ও গ্রন্থপ্রনেতা।



ফেইসবুকে আমরা