বাংলাদেশ, , শুক্রবার, ২২ মার্চ ২০১৯

বীর মুক্তিযোদ্ধা হাবিবউল্লাহ জাহিদ স্বরণে : সাফাত বিন ছানাউল্লাহ্

  প্রকাশ : ২০১৯-০৩-০৭ ২০:২৫:৫৭  

পরিস্হিতি২৪ডটকম : আমার সম্মানিত বড় আব্বু মরহুম হাবিবউল্লাহ জাহিদ। ডাক নাম (মিঞা) নামেই সমধিক পরিচিত। একাধারে তিনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, তুখোড় রাজনীতিবিদ, সাংস্কৃতিক সংগঠক ও দরাজগলার একজন শিল্পী। ধর্মীয় গণ্ডির মধ্যে বেড়ে উটা হলেও অসাম্প্রদায়িক চিন্তা চেতনার একজন মননশীল ব্যক্তিত্ব।
১৯৪৩ সালের কোন এক শুভক্ষণে সারা বাংলাদেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সূতিকাগার বীর চট্টলার স্বনামধন্য চন্দনাইশ উপজেলার সাতবাড়ীয়া গ্রামের ঐতিহ্যবাহী (ক্বারি বাড়ী) তে জন্মগ্রহণ করেন।
পিতা : বিশিষ্ট শিক্ষানুরাগী, পীরে কামেল হযরত আল্লামা সৈয়দ আব্দুল মান্নান (রাহঃ) ও মাতা : মরহুমা মোছাম্মৎ মালেকা খাতুন। পিতা-মাতার ৫ সন্তানের মধ্যে (তিন ছেলে দুই মেয়ে) সবার বড় ছেলে তিনি। ছোট বেলা থেকে অত্যন্ত তীক্ষ্ণ মেধাসম্পন্ন হাবিবউল্লাহ জাহিদ প্রাথমিক ও উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষা গ্রহণ গ্রামেই শেষ করেন। পড়ালেখা করা অবস্থায় শিক্ষাদীক্ষা, রাজনীতি, ধর্মীয় ও সমাজসেবায় সমগ্র চট্টগ্রাম জুড়ে সুপরিচিত গ্রাম সাতবাড়ীয়ায় সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে ব্যাপকভাবে ভূমিকা রাখেন। এরপর চট্টগ্রাম শহরে গিয়ে সিটি কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা গ্রহণ অবস্থায় আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত হন।
ষাটের দশকে বামপন্থি রাজনীতি দিয়ে শুরু হলেও ৬৬-এর ছয় দফা আন্দোলনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগে যোগদান করেন। ৭০-এর উত্তাল গণআন্দোলনে জননেতা মরহুম এম,এ,আজিজ এর নেতৃত্বে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগে। পরবর্তীতে চট্টগ্রাম মহানগর ও বিভিন্ন ওয়ার্ড আওয়ামী লীগেও দল পুনর্ঘটনে ব্যাপকভাবে ভূমিকা পালন করেন। তবে, ৮০’ র দশকে দলের অনেক সিনিয়র নেতৃবৃন্দের দুর্ব্যবহার ও বিভিন্ন অনিয়মের প্রতিবাদে রাজনীতি থেকে পরোক্ষভাবে অনেকটা দুরে ছিলেন।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীন সার্বভৌম দেশ বিনির্মাণের অন্যতম কারিগর একজন সাহসী, অকুতোভয় বীর সৈনিক হাবিবউল্লাহ জাহিদ ভারতের দেরাদুনে প্রশিক্ষণ নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন করেন এবং ২ নং সেক্টরে প্লাটুন কমান্ডার হিসেবে নেতৃত্ব দেন।
যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ও মুক্তিযোদ্ধা সংহতি পরিষদ (চট্টগ্রাম বিভাগ) -এ বলিষ্ঠ কন্ঠ রেখেছেন। ৮০-র দশকে প্রতিষ্ঠা করেন বাঙালী জাতীয়তাবাদ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাভিত্তিক সংগঠন ‘সমন্বয়’, যা অবশ্য আজ বিলুপ্ত।
বিভিন্ন চাকরী করার পাশাপাশি একজন সংস্কৃতি মনা ব্যক্তি হিসেবে কণ্ঠশিল্পী হিসেবেও খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। ভারতের কিংবদন্তি শিল্পী হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কে অনুসরণ করতেন গানের ক্ষেত্রে। ওনার কণ্ঠেও হেমন্তের মিল ছিল কাকতালীয় ভাবে। গ্রাম বা শহরে কোথাও অনুষ্ঠান হলে মঞ্চে গান করতেন অনন্য সঙ্গীদের সাথে। মঞ্চ নাটকে অভিনয়েও সমান পারদর্শী ছিলেন। তৎকালিন সময়ে অসম্ভব জনপ্রিয় নবাব সিরাজদৌল্লাহ চরিত্রে অভিনয় করে দক্ষতার পরিচয় রাখেন তিনি। খেলাধুলা ও শরীরচর্চাতে যোগ্যতার পরিচয় দেন বহুগুণী হাবিবউল্লাহ জাহিদ।
ব্যক্তিগত জীবনে দুই পুত্র সন্তান – আহসান উল্লাহ (জাহিদ) ও রাহাতউল্লাহ (জাহিদ) এর গর্বিত জনক তিনি। ওরাও দেশের শিক্ষা ও রাজনীতিতে অবদান রেখে যাচ্ছেন।
রাজনীতি করতে গিয়ে দলের জন্য আপোষহীনতা ও নিঃসার্থপরতার জন্য সতীর্থরা অনেকেই দুরে চলে গিয়াছিলেন। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও রাজনীতিবিদ হয়েও দলের কেউ তার খোজ খবর নিতেন না বললেই চলে। ২০০২ সালের ৫ মার্চ তিনি ইন্তেকাল করেন। প্রতি বছর মৃত্যুবার্ষিকীর দিনটিকে পরিবারের পক্ষ থেকে গ্রামের বাড়ীতে যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন করা হয়।মহান স্বাধীনতার এই মাসে বীর মুক্তিযোদ্ধা হাবিবউল্লাহ জাহিদ (মিঞা) কে বিনম্র শ্রদ্ধায় স্বরণ করছি ।
লেখক : কলামিষ্ট,
সদস্য চট্টগ্রাম ইতিহাস চর্চা কেন্দ্র।



ফেইসবুকে আমরা