বাংলাদেশ, , রোববার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯

হাউজে শামসি এক ঐতিহাসিক বরকতময় নিদর্শন : মোহাম্মদ আবদুর রহিম

  প্রকাশ : ২০১৯-০৯-০৫ ১৯:৩৩:৫৬  

পরিস্হিতি২৪ডটকম : ডায়মন্ড সিমেন্ট লি. ভারত সফর ও জিয়ারতের প্রথম দিন, আমরা দিল্লির প্রাইড হোটেল হতে ১৫ আগস্ট ২০১৯ তারিখ সকালের ব্রেকফাস্ট সেরে চল্লিশ জনের একটি কাফেলা ডায়মন্ড সিমেন্ট লিমিটেডের পরিচালক লায়ন আলহাজ্ব হাকিম আলীর নেতৃত্বে রওয়ানা হলাম মেহেরুলী শরীফ হযরত খাজা কুতুবউদ্দিন বখতেয়ার কাকী (রহ.) দরগাহ জিয়ারতের উদ্দেশ্যে। আমাদের তাপানুকূল বাসটি মেহেরুলীর একটি বাস স্টেশনে দাঁড়িয়ে গেল। আমরা চল্লিশ জন ছোট গলি পথ ধরে দরগাহে খালি পায়ে হেঁটে চলে গেলাম। দরগাহ এলাকাটি মুসলিম অধ্যুষিত। ফুল ও ছোট ছোট গিলাপের পসরা নিয়ে ছোট ছোট দোকান ও খাবার দোকান বেশি। আমাদের এই সফরে নতুনত্ব ছিল। সাথে ছিলেন মাওলানা মুখতার আহমদ।

তিনি অনেকগুলো বরকতময় স্থান চিনেন। দরগাহ কম্পাউন্ডে মাহবুবে এলাহির জিয়ারতের স্থান, বাবা ফরিদ গঞ্জেশেখর এর ধ্যান করার স্থান এই প্রথম দেখলাম। সম্মিলিত জিয়ারত শেষে আমরা হাউসে সামসি, সামসুতুল্লা ব আবদুল হক মুহাদ্দেস দেহলভীর জিয়ারতের উদ্দেশ্যে পায়ে হেঁটে যাত্রা করলাম। বিশ মিনিট যাত্রার পর হাতের বামে দেখতে পেলাম একটি পুরনো মসজিদ। আমরা প্রবেশ করলাম। সুলতানী ঐতিহ্যে তৈরি খুব সুন্দর মসজিদ। বর্তমানে পরিত্যক্ত। খাজা কুতুবউদ্দিন বখতেয়ার এর খলিফা সুলতান সামসুদ্দিন আলতামাস এটি তৈরি করেছিলেন। এজাজ মাহমুদ ও সোহেল মো. ফখরুদ-দীন ভাই ইচ্ছেমত ভিডিও ও ছবি নিলেন। আমরা বামপাশ দিয়ে নিচে নামতেই চোখে পড়ল একটি বিশাল দিঘী। কচুরিপানায় পরিপূর্ণ। দিঘীর চারপাশ রিটার্নি ওয়াল দিয়ে ঘেরা। লোহার গ্রিল দিয়ে নিরাপত্তা বেষ্টনী দেয়া। দিঘীর পশ্চিম পাশে সামান্য পার্কের মত করে তৈরি। দণি পাশে এক জায়গায় একটি ছোট সুলতানী আমলের স্থাপনা। পার্কে বসে কিছু মানুষ অলস সময় কাটাচ্ছেন। সবাই বিমুগ্ধ হলেন। এতবড় দিঘী, এত বড় মজবুত রিটার্নিং ওয়াল, কিন্তু বর্তমানে পরিত্যক্ত অবস্থায়, কচুরিপানায় ভর্তি। এই বরকতময় ঐতিহাসিক নিদর্শন নিয়ে কুতুবুল ইসলাম খাজা কুতুবউদ্দিন বখতেয়ার কাকী (রহ.) এর পবিত্র মুখনিঃসৃত বাণীর উপর ভিত্তি করে জগদ্বিখ্যাত দরবেশ অলি চিশতিয়া তরিকার উজ্জ্বল নক্ষত্র বাবা শেখ ফরিদ উদ্দিন গঞ্জেশেখর লিখিত ফাওয়ায়েদুস সালেকিন এর বাংলা অনুবাদ সহায়তায় হাউসে সামসি এর বর্ণনা।
শনিবার, ২০ জিলহজ¦, ৬৪৮ হিজরি। মজলিশের শুরুতে কদমবুসি লাভ করলাম। মাননীয় সুফী-দরবেশগণ ও আল্লাহর করণাপ্রাপ্ত ব্যক্তিবর্গ মহতী মজলিসে উপস্থিত ছিলেন। ‘শামস’ এর দিঘী প্রস্তুতের ঘটনা সম্বন্ধে আলোচনা শুরু হলো। হযরত খাজা কুতুবুল ইসলাম এরশাদ করলেন, যখন সুলতান শামসুদ্দিন আলতামাস কিংবদন্তি দিঘী স্থাপন করতে চাইলো তখন তার জন্য উপযুক্ত স্থান নির্বাচনে প্রত্যেক দিন মন্ত্রীবর্গকে সাথে নিয়ে বেরুতেন। যখন তারা বর্তমান দিঘীর নিকট পৌঁছালো তখন সেখানকার জমি দেখে সুলতানের অত্যধিক পছন্দ হলো। সে তার মন্ত্রীদের বললো প্রস্তাবিত দিঘীর জন্য স্থানটি অত্যন্ত উপযোগী। মন্ত্রীগণও স্থানটি পছন্দ করলো। সুলতান আল্লাহর সাাতকারীও ছিলেন। প্রাসাদে পৌঁছে পবিত্র কোরান তেলাওয়াত ও প্রয়োজনীয় তরিকতের তসবিহ পাঠের পর নির্ধারিত সময়ে শুয়ে পড়লো। রাতে স্বপ্নে দেখলো দিঘীর জন্য নির্বাচিত স্থানের সন্নিকটে মধ্যাকৃতির লম্বা কেশবিশিষ্ট এক অনিন্দ্যপুরুষ, যার রূপ সৌন্দর্য বর্ণনাতীত, কয়েকজন পরিচারক ও বন্ধু সঙ্গী সাথী নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। একবার সুলতান তাদের দিকে দৃষ্টিপাত করছে আবার তারাও সুলতানকে দেখছেন, এ সময় তাদের মধ্য হতে একজন লোক সুলতানের নিকট এসে বললো, এসো তোমাকে রাসুল (স.) এর যিয়ারত করিয়ে দিচ্ছি। তিনি তার সাথে গেল। আগন্তুক ঘোড়ার উপর উপবিষ্ট নূরানী চেহেরার বিশিষ্ট ব্যক্তিকে দেখিয়ে বললেন, হে শামস্, উনিই হচ্ছেন হুজুর পাক (স.), তোমার যা কিছু আরজ করার আরজ কর। সুলতান তাঁর কদম মোবারকে পড়ে গেলো এবং যে হাউজ তৈরীর বাসনা তার অন্তরে ছিলো আবেদন করলেন্ রাসুলে পাক (স.) ঘোড়াকে স্বীয় গোড়ালি দ্বারা আঘাত করলেন। ঘোড়া লাফিয়ে উঠলো এবং পায়ের আঘাত মাটিতে পড়তেই সেখান থেকে পানি বেরিয়ে আসলো। রাসুলে পাক (স.) এরশাদ করলেন, হে শামস্, এই জায়গায় হাউজ তৈরি কর, কেননা এখানকার মতো সুস্বাদু ও মিষ্টি পানীয় পৃথিবীর কোথাও নেই। সুলতান নিদ্রা হতে জাগ্রত হয়ে উজিরদের সাথে নিয়ে নির্দিষ্ট স্থানে গিয়ে দেখলেন ঘোড়ার পায়ের দাগ ও পানীয় নহর বর্তমান রয়েছে। দেখলেন তার পীর মুর্শিদ কুতুবুল ইসলাম খাজা কুতুবুদ্দীন বখতেয়ার কাকী (রহ.)ও সেখানে দাঁড়িয়ে আছেন। শামসুদ্দীন ঘোড়া হতে নেমে পানি পান করলো এবং মন্ত্রীগণ পান করলো। পানির প্রশংসায় সবাই বললো, এমন সুস্বাদু পানীয় দুনিয়ার কোথাও পাওয়া যাবে না। এরপর খাজা কুতুবুল ইসলাম এরশাদ করলেন, তোমরা পানিতে যে সুস্বাদু ও মিষ্টতা অনুভব করছো সে সবই হুজুর (স.) এর কদম মোবারকের সদকা এবং দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে, যে এসব হাউজের নিকটে ও আশেপাশে সর্বদা খোদার প্রেমিকগণ পরিতৃপ্ত হন এবং জানি না কেয়ামত পর্যন্ত তাঁরা কী রূপে পরিতৃপ্ত হবে। এরপর হযরত খাজা কুতুবুল ইসলামের চোখ অশ্রুতে ভারাক্রান্ত হয়ে উঠলো।

লেখক: ইতিহাস ও অর্থনীতির গবেষক-লেখক; ডিজিএম (মার্কেটিং), ডায়মন্ড সিমেন্ট লিমিটেড, চট্টগ্রাম



ফেইসবুকে আমরা