বাংলাদেশ, , শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০

স্বেচ্ছাসেবীদের নিঃস্বার্থ সেবাদানে গড়ে উঠুক মানবিক সমাজব্যবস্থা : ডা. মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন

  প্রকাশ : ২০২০-০১-২০ ১৯:৩০:৩০  

পরিস্হিতি২৪ডটকম : বাংলা ভাষায় বহুল ব্যবহৃত “নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো” প্রবাদটি অনেকে কৌতুক করে বললেও এ প্রবাদের ভেতরেই স্বেচ্ছাসেবার মূল অন্তর্নিহিত। মানবিক দাযবদ্ধতা থেকে মানুষসহ সকল প্রাণীর কল্যাণে কোনো ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠানের নিঃস্বার্থ প্রচেষ্টা চালানোই স্বেচ্ছাসেবা। মানুষ সমাজবদ্ধ জীব এবং একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। যে ব্যক্তি কোনো কিছুর বিনিময় ছাড়াই স্বেচ্ছায় সেবা প্রদান করে, প্রকারান্তরে সেবা প্রদানকারী এর মাধ্যমে সেবা গ্রহীতার প্রতি তার দায়বদ্ধতা হতে মুক্ত হওয়ার সুযোগ পায়। প্রশ্ন জাগতেই পারে, আমরা কিভাবে অন্যের কাছে দায়বদ্ধ। এর উত্তরে স্বাভাবিকভাবেই বলা যায, পৃথিবীর এমন কোনো ব্যক্তি নেই যে সারা জীবনে প্রাপ্ত প্রত্যেকটি সেবার সঠিক এবং সময়মতো মূল্য প্রদান করতে সম হয়েছে। তাই সে প্রত্যেকে সমাজের নিকট মানবিক এবং ব্যক্তিগত কারণেই দায়বদ্ধ। আর সে দায়বদ্ধতা হতে কিছুটা পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব, যদি স্বেচ্ছাসেবার মাধ্যমে ব্যক্তি/সমাজের প্রকৃত কল্যাণে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী অবদান রাখা সম্ভবপর হয়। সামাজিক সেবার ক্ষেত্রে স্বেচ্ছাসেবক শব্দটি প্রথম ১৬৩০ সালে ব্যবহৃত হয়। তারপর ১৭৫৫ সালে এম.এফ.আর, ভলান্টিয়ার সর্বপ্রথম সামরিক সেবা প্রদানে ইচ্ছুক ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে স্বেচ্ছাসেবক (Volunteer) শব্দটি ব্যবহার করেন। স্বেচ্ছাসেবা মূলত সামরিক ক্ষেত্রে প্রধানত ব্যবহার হলেও আধুনিক কালে কমিউনিটিভিত্তিক/সামাজিকসেবার ক্ষেত্রেও স্বেচ্ছাসেবা (Volunteering)ব্যপকভাবে ব্যবহার হচ্ছে। সাধারণত স্বেচ্ছাসেবার মাধ্যমে প্রকৃতভাবেই কিভাবে ব্যক্তি এবং সমাজ লাভবান হতে পারেন তা আলোকপাত করেছেন বিভিন্ন সমাজবিজ্ঞানী । জু এবং নেগাই এর মতে, “উন্নয়নশীল দেশে তৃণমূল পর্যায়ে স্বেচ্ছাসেবা প্রসারের মাধ্যমে বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে প্রকৃত সমন্বয় এবং একইসাথে সুশীল সমাজ প্রতিষ্ঠায় সহাযতা করতে পারে। স্বেচ্ছাসেবার ক্ষেত্রে উচ্চ নৈতিকতার চর্চা ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠানের আত্মবিশ্বাস প্রতিষ্ঠা এবং চ্যালেঞ্জ মোকালেবলায় সাহস যোগায়; একইসাথে ইমানুয়েল কান্ট এর “কী ধরনের কাজ” বা স্বেচ্ছাসেবা(What ought I to do) সংক্রান্ত আত্মজিজ্ঞাসার উত্তর পেতেও সহাযতা করে।এক্ষেত্রে তা স্বেচ্ছাসেবায় অংশগ্রহণকারীকে আত্মপ্রত্যয়ী হতে অর্থাৎ ব্যক্তির পছন্দনীয় নৈতিক বিশ্বাসের ওপর আস্থা অর্জন প্রধান অবদান রাখে। তাই, মূল্যবোধ, লক্ষ্য এবং সংস্কৃতিগত ভিন্নতা সত্ত্বেও উচ্চ নৈতিকতা থাকলে বিভিন্ন ব্যক্তি একত্রে একটি সংগঠনের আওতায় একই ধরনের স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজে অংশগ্রহণ বা স্বেচ্ছাসেবার বিস্তারে প্রকৃত অবদান রাখতে পারে। আর এভাবে উচ্চ নৈতিকতাসম্পন্ন বা নৈতিকতার চর্চাকারী যে কোনো প্রতিষ্ঠান সহজে অন্য যে কোনো প্রতিষ্ঠান যাদের নৈতিকতা/বিশ্বস্ততা প্রশ্নবোধক তাদের তুলনায় দ্রুত সাধারণ জনগণ এবং সরকারের আস্থা এবং সমর্থন অর্জন করতে সম হয়। স্বেচ্ছাসেবার প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য কিংবা বাজার অর্থনীতি এবং সার্বজনীন কল্যাণের মধ্যে দৃষ্টিভঙ্গিগত পার্থক্যের কারণে এর প্রয়োগগত এবং দর্শনগত পার্থক্য পরিলতি হয়। সার্বিকভাবে এশীয় সমাজে সার্বজনীন কল্যাণের দৃষ্টিকোণ হতে স্বেচ্ছাসেবায় অংশগ্রহণ করে, যার মাধ্যমে ব্যক্তি অর্থনৈতিক বা বৈষয়িকভাবে লাভবান হওয়া তার ল্য হতে পারবে না। স্বেচ্ছাসেবার মাধ্যমে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্যক্তি তার যোগ্যতারও প্রমাণ পেতে পারে, কিংবা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বা ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে কারো দ্রুত কর্মসংস্থানও হতে পারে। আবার, এ ধরনের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সামাজিক সম্মান অর্জনও হতে পারে, কিন্তু স্বেচ্ছাসেবার প্রকৃত লক্ষ্য হবে মানবিক এবং সামাজিক দৃষ্টিকোণ হতে স্বেচ্ছাসেবায় অংশগ্রহণ করা। মূলত অন্যের ব্যথায় সমব্যথী হওয়া এবং পরের বিপদে সহযোগিতার হাত প্রসারিত করা একটি মহৎ গুণ। এবং এক ধরনের মহৎ কাজ ও হিতৈষী মনোভাব ও সহমর্মিতার গুণ ছাড়া মানবিকতা ও মহানুভবতার বিকাশ পূর্ণতা পায় না। তাই ধর্মে মানবসমাজে বৈষম্য ও প্রভেদের কোনো সুযোগ রাখেনি। ধর্ম মানুষকে সর্বোচ্চ মানবিকতা, পরহিতৈষণা, সহমর্মিতা ও মহানুভবতার শিক্ষা দিয়েছে। বর্তমান সমাজে কিছু মানুষ আছে লোক দেখাতে কাজ করে, এক কথায় ব্যানার দিয়ে সমাজসেবা প্রচারণা চালায়। সে নিজেকে সমাজসবেক হিসেবে দাবি করে। এরকম কিছু সংগঠন বা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন রয়েছে, যা কখনো মানুষের মঙ্গল করে না। এরা সারাবছর কোন কাজ না করে ক্রেস্ট বিতরণের মত প্রোগ্রাম করে সেখানে অমুক তমুক অতিথিতে দাওয়াত দেয় এবং টাকায় মিডিয়া এনে চালায় প্রচার প্রচারণা। তাদের বুঝা উচিত, যে টাকায় তারা এমন ভণ্ডামি করে সে টাকায় অনেক লোকের উপকার সম্ভব। হাস্যকর হলেও সত্যি যে, ২০০০ টাকার সাহায্য বিতরণে ১০,০০০ টাকার ডেকোরেশন করে। সারাবছরে একটা বা ২টা মুড়ি বিতরণ বা ফুল বিতরণ করতে পারলে এর ছবি ১২ মাসে ২৪ বার দিবে। তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে নিজেদের ঢাক-ঢোল পিটাইতে থাকে এবং তারা নিজেদের অনেক মহৎ কাজের অংশীদার বলে ভাবে। আসলে তারা কিছুই নয়। তারা কাজের বেলায় ঠন ঠন গোপাল। এই মানসিকতার মানুষগুলোর কারণে সুন্দর মনের মানুষগুলো অসম্মানিত হয়, এসব নামধারী সংগঠনগুলোর কারণে প্রকৃত সংগঠনগুলো যথাযথ মূল্যায়ন পায় না, মানুষের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হয়। এসব নামধারী সংগঠনগুলো সেবার জগতে আগাছার মত! ভালো কাজ কখনো মানুষকে ছোট করে না, ছোট করে তার ভালো মানুষরূপী অসভ্য চরিত্রটি। যদি আমাদের ভিতর ভালো হওয়ার সামর্থ্য না থাকে তাহলে কখনো ভালো হতে পারবো না এমন কি মানবসেবার মত পবিত্র জায়গায়ও আসতে পারবো না। এমনিতেই আমরা নিজেদের প্রাপ্তির জন্য খুব বেশি আত্মকেন্দ্রিক হয়ে যাচ্ছি। সবাই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত আছি। নৈতিক ও সামাজিক অবয় আমাদের মানবিক মূল্যবোধকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। একজন আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার কোনো চেষ্টাই আমরা করি না! শুধু দৌড়াচ্ছি। এ নিয়ে ভাবার আমাদের সময় নেই। আমরা কেমন জানি একটা বেড়াজালের মধ্যেই রয়ে যাচ্ছি। আসলে সমাজসেবী হিসেবে আমরা খুব একটা এগোতে পারছি না এবং খুব একটা এগোচ্ছি বলে মনে হয় না। এর পরেও দু-একটি ভালো অর্জন আমাদের আছে! সেগুলোও নষ্ট হয়ে যায় নৈতিক অবয়ের কাছে, সামাজিক অবয়ের কাছে। এই নৈতিক ও সামাজিক অবয়ের কারণে আমাদের সব অর্জন ম্লান হয়ে যাচ্ছে। আমরা আমাদের অর্জনকে ধরে রাখতে পারছি না। একটা দেশ বা জাতি যতই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধ হোক অথবা বিশ্বে প্রসিদ্ধি লাভ করুক যদি সমাজে বসবাসকারী মানুষগুলোর প্রয়োজন পূরণে ভূমিকা না রাখতে পারে অথবা সমন্বয় না করতে পারে তা হলে সমাজে নানাবিধ ফিতনা-ফাসাদসহ জাতির মাঝে ফাটল সৃষ্টি হয় যা ক্রমশ একটি জাতিকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়। আর এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্য মানুষকে নিজেদের কাজের পরিধির বাইরে এসে অতিরিক্ত সেবামূলক কাজ করতে হবে। প্রতিটি এলাকায় মানুষকে খাদ্য ও নিরাপত্তাসহ যাবতীয় প্রয়োজনীয় ও চাহিদাগত বিষয়ে অতিরিক্ত সেবামূলক কাজে উৎসাহিত করতে হবে। তাই আসুন উপরোক্ত বিষয়ের আলোকে একটি সুন্দর সমাজ গঠন করি, যেখানে মানবিক কোনো ভেদাভেদ ছাড়া সকলেই এক দেহ এক প্রাণ হবো, সুখে-দুঃখে সবসময় একে অন্যের পাশে দাঁড়াবো।

লেখক: প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট এবং কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ পরিবেশ উন্নয়ন সোসাইটি।



ফেইসবুকে আমরা