বাংলাদেশ, , বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২০

সাধনাই মানুষের বিশালতা : ড.মুহাম্মদ মাসুম চেীধুরী

  প্রকাশ : ২০২০-০৭-২১ ১৪:৫৯:৫৩  

পরিস্হিতি২৪ডটকম : মহাবীর নেপোলিয়ন বলেছিলেন, ‘অসম্ভব’ শব্দটি বোকাদের অভিধানে লেখা থাকে। মানুষের জন্ম বিজয়ের জন্য, ব্যর্থ হওয়ার জন্য নয়। আমাদের মস্তিষ্কে রয়েছে আঠারো বিলিয়ন কার্যকরী কোষ। আমরা এই মস্তিষ্কের ক্ষমতার চেয়ে অক্ষমতা নিয়ে জীবন কাটাই। ক্ষমতা কোথায়? ক্ষমতা রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রী এমপি’র চেয়ারে নয়,কোন পদ পদবীতে নয়,ক্ষমতা মাথায়। তার বিকাশ হয় সাধনায়। বিপ্লবের শ্লোগানে কোনদিনই প্রকৃত বিপ্লব আসবে না।বিপ্লব আসে সাধনার দৃঢ় প্রতিজ্ঞার মাধ্যমে।
সাধনার দৃঢ় প্রতিজ্ঞার কারণে দরিদ্র কাঠুরিয়ার ছেলে মুদির দোকানের চাকর আব্রাহাম লিংকন জগৎ খ্যাত বক্তা এবং আমেরিকার সেরা প্রেসিডেন্ট হন। দারিদ্র্যতার কারণে মাত্র পাঁচ বছর স্কুলে অধ্যয়ন করা সম্ভব হলেও চরম ধৈর্য্য সাধনায় জগতের সেরা নাট্যকার হন নোবেল বিজয়ী জর্জ বার্ণাড শ’।খ্যাতিমান নৃত্যশিল্পী সুধা চন্দনের দুটো পা কাটা যায় দুর্ঘটনায়।কিন্তু তিনি নৃত্যশিল্পী হবেনই। কৃত্রিম কাঠের পা লাগিয়ে সাধনা করেন এই শিল্পী। তিনি স্বাভাবিক সুন্দর নৃত্য দেখিয়ে সবাইকে অবাক করেন। বিখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ বেটোফেন তাঁর প্রথম সিম্ফনিটি রচনার পর কালা হয়ে যান। তিনি নিজের সৃষ্ট মিউজিক নিজেই শুনতে পেতেন না। তারপরও তিনি সাধনা করে মিউজিকের পর মিউজিক সৃষ্টি করে বিখ্যাত হন। স্ট্যালিন ছিলেন মুচির ছেলে। সাধনায় সোভিয়েত ইউনিয়নের হন রাষ্ট্রপ্রধান। মুসোলিনি ছিলেন সাধারণ স্কুল শিক্ষক। কঠোর সাধনায় হন ইতালির প্রেসিডেন্ট। হিটলার ভিয়েনা অ্যাকাডেমিতে ভর্তির অযোগ্য হয়ে বেকার রাস্তায় গৃহহীনদের সাথে রাত কাটাতেন। শীতের সময় জার্মান রাস্তায় বরফ পরিস্কার করার শ্রমিকের কাজ করে আহার যোগাতেন। বড় হওয়া তার স্বপ্ন। জীবন যুদ্ধে হার মানবে না।জীবন সংগ্রাম সাধনায় তিনি একদিন হয়ে গেলেন জার্মান রাষ্ট্রনায়ক। বিশাল মোগল সম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা জহির উদ্দিন মোহাম্মদ বাবর ছিলেন ছোট এক জমিদারের সন্তান। তাঁর স্বপ্ন ছিল বিশাল সম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করা। কঠোর সাধনায় ধীরে ধীরে তিনি রাজ্যের পর রাজ্য জয় করে একদিন বিশাল মোগল সম্রাজ্যের হয়ে উঠেন প্রতিষ্ঠাতা।
সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমের ছোট্ট এক ঘরের পিছনে জন্মগ্রহণ করে এক শিশু। বাবা তখন দেনার দায়ে দেউলে। শিশুটি ছিল রোগা দুর্বল। বাবা অভাবের কারণে শিশুটিকে ফেলে মনের দুঃখে বিদেশ পাড়ি দেয়। মা অনেক কষ্টে ছেলেটিকে বড় করেন। এই ছেলেটি সাধনার স্বাদ মিটিয়ে হয়ে যান জগৎ বিখ্যাত বিজ্ঞানী। যাঁর নামে নোবেল পুরস্কার ডিনামাইটের আবিস্কারক আলফ্রেড নোবেল।
অভাবের কারণে সন্ধ্যার পর পড়া শোনা করতে প্রদীপের তেল জুটতো না ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের। রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের আলোয় দাঁড়িয়ে পড়া শোনা করতেন। ছাত্র জীবনে পড়ার সময় মাথার চুলের টিকির সাথে দড়ি বেঁধে দিতেন কুটির সাথে। পড়তে পড়তে ঘুমে ঢলে পড়লে যেন টিকিতে টান পড়ে ঝিমুনি কেটে যায়। এ ভাবে সাধনার পর সাধনা করে একদিন তিনি হয়ে উঠেন বিদ্যাসাগর।
দুনিয়ার ৯০ ভাগ সফল মানুষ গরীব ঘরে জন্মগ্রহণ করে কঠোর সাধনায় বড় হয়েছেন। তাঁদের বাবারা অধ্যাপক ডাক্তার বিজ্ঞানী দার্শনীক ইঞ্জিনিয়ার বা কোন শিক্ষিত লোক ছিল না। শৈশবে পিতৃহীন হন সত্যজিৎ রায়,শিল্পী গনেশ পাইন, নোবেল বিজয়ী ফরাসি সাহিত্যিক আলবেয়ার কাম্যু এবং তাঁর বন্ধু জাঁ পল সার্ত্রে(তাঁর মা মানুষের ঘরে বুয়ার কাজ করতো)। ধনকুবের রজতগুপ্ত মা বাবা দুইজনকে হারান শৈশবে। কবি কাজী নজরুল ইসলাম আট বছর বয়সে বাবা ফকির আহমদকে হারিয়ে চরম দুঃখে নিপতিত হয়ে দুখু মিয়ায় পরিণত হন। দারিদ্র্যতার কারণে ম্যাক্সিম গোর্কির মত আত্মহত্যার পথ বেছে না নিয়ে কঠোর সাধনায় তিনি দুঃখ জয় করেন। ম্যাক্সিম গোর্কি রেলস্টেশনে কুলি ও দোকানের বয়ের কাজ করে ফাঁকে ফাঁকে লাইব্রেরীতে গিয়ে বই পড়ে লেখক হিসেবে বিশ্ব খ্যাত হয়েও দারিদ্র্যের কাছে পরাজিত হন।
সমুদ্রের গভীরতা মাপা যায়, মানুষের ক্ষমতার গভীরতা মাপা কঠিন। সমুদ্রের তলদেশ হতে মণিমুক্তা আহরণে ডুবুরি হতে হয়। ডুব না দিয়ে পানির উপর ভেসে থেকে মণিমুক্তা আহরণ করা অসম্ভব। সাধনা না করে সফলতা অসম্ভব।
পুলিৎজার পুরস্কারের প্রবর্তক জোসেফ পুলিৎজার ৪০ বছর বয়সে অন্ধ হয়ে যায়। হেলেন কিলার, মহাকবি হোমার এবং পারস্য কবি রুদকি তাঁরা সবাই ছিলেন জন্মান্ধ। বিশ্বের খ্যাতিমান শিক্ষাবিদ মিসর আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি ড.তাহা হোসাইন ছিলেন জন্মান্ধ। অকল্পনীয় জ্ঞানের অধিকারী এই ব্যক্তিত্ব সে দেশের শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করে মিসরে আলো ছড়ান।তাঁরা সবাই সাধনার আলোয় অন্ধকার দূরীভূত করেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট ৩৯ বছর বয়সে পক্ষাঘাত রোগে দুই পা পঙ্গু হওয়া সত্ত্বেও তিনিই একমাত্র ব্যক্তি যিনি চার বার (দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের কারণে) আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।শারীরিক পঙ্গুত্বকে গুরুত্ব না দিয়ে মানসিক শক্তি সাধনায় যুদ্ধোত্তর দেশটিকে তিনি শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিনত করেন। আরেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ড ছিলেন মডেল, ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী গোল্ডামেয়ার ছিলেন সাধারণ স্কুল শিক্ষক। তাঁরা সবাই কঠোর সাধনায় বড় হয়েছেন।
মানুষ কঠোর অধ্যাবসায়ের মাধ্যমেই গড়ে তুলেছে, রোম নগরী, তাজমহল, মিসরের পিরামিড, চীনের মহাপ্রাচীর, ব্যবিলনের শূণ্য উদ্যাণ, প্রাচীন সভ্যতার নানা নিদর্শন এবং আধুনিক কালের হাজারো বিস্ময়। বলা হয়,’Rome Was not built in a day’.রোম একদিনে গড়ে উঠেনি। সব সৃষ্টিই দীর্ঘদিনের সাধনার ফসল।
মহাকবি আবুল কাশেম ফেরদৌসী দীর্ঘ ত্রিশ বছর সাধনা করে রচনা করেন তাঁর অমর কাব্য ‘শাহনামা’। কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই দারিদ্র্যের সাথে সংগ্রাম করে নিজের সাধনায় আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ দুই হাজার প্রাচীন পুঁথি সংগ্রহ করে বাংলা সাহিত্যের চার শত বছরের অজানা অধ্যায় উদঘাটন করেন। ক্ষুদ্র জাহাজে করে কঠিন বাধা অতিক্রম করে সমুদ্র পথ পাড়ি দিয়ে কলম্বাস আবিষ্কার করেন নতুন দেশ আমেরিকা। মানুষের অসম্ভব শক্তি। সাধনায় জয় করতে পারে না এমন কিছু মানুষের অভিধানে নেই।
ধনকুবের বিল গেটস।মাইক্রোসফট কোম্পানির মালিক। পরীক্ষায় ফেল করলেও সাধনার কারণে জীবনের পরীক্ষায় সেরা হন। ব্যবসা ছিল তাঁর পরিবারের অজানা অধ্যায়।মাত্র ২০ বছর বয়সে বাল্যবন্ধুর সাথে দশ হাজার ডলার মূলধনে সফটওয়্যার কোম্পানি গড়ে তোলেন। ২৩ বছরে তাঁর সম্পদের পরিমাণ দাঁড়ায় ২ লক্ষ ৫৪ হাজার কোটি ডলার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্ণর অর্থনীতিবিদ ড. আতিউর রহমানের হালের গরু না থাকায় নিজেই জমিতে লাঙল টেনে, বাজার হতে টাকা তুলে লেখা পড়া করে বড় হয়েছেন। সৃষ্টিতত্ত্বের সেরা বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং দুরারোগ্য ব্যাধির কারণে পুরো শরীরটা ছিল অকেজো। শেষ জীবনে এসে একটি মাত্র আঙুল ছিল সচল। তিনি থামেননি, দমে যাননি,রোগের নিকট হার মানেননি। একটি আঙুলের সাহায্যে কম্পিউটারের বাটন টিপে মহাবিশ্বের নতুন নতুন তত্ত্বের পর তত্ত্ব দিয়ে বিশ্ববাসীকে বিস্মিত করে বিদায় নিলেন। আমরা এখন করোনা কাল অতিক্রম করছি। করোনার পর দুনিয়ার দ্বিতীয় যুদ্ধ অর্থনৈতিক সংকট। তরুণ সমাজ এখন এই কঠিন যুদ্ধের মুখোমুখি। মহামনীষীদের সাধনার জীবন স্মরণ নয়, অনুসরণ করে এগিয়ে যেতে হবে। হতাশ হলে চলবে না। এ রোগ নিয়ে জীবন নদী পার হওয়া যায় না। হতাশা কিছুই দেয় না, শুধু আশা গুলো বিনষ্ট করে দেয়। জীবন একটি, জীবনকে ভালবাসুন। জীবনের জন্য সফল হতেই হবে। মনে রাখবেন, সফলতার অনেক পিতা ব্যর্থতা এতিম। ইতিহাসের সেরা নিন্দিত ব্যক্তির নাম ‘হিটলার’। তার অপরাধ মানুষ হত্যা নয়,যুদ্ধে পরাজয়। বিজয়ী হলে তিনি হতেন বিশ্ববিজয়ী বীর ‘হিটলার দি গ্রেট’। বিশ্ববিজয়ীরা তো মানুষ হত্যা করেই মহাবীর গ্রেট হন।ইতিহাসের বিচারের রায় পরাজিতের পক্ষে যায় না। এটি নির্মম বাস্তবতা,বড় এক ট্রাজেডি।
লেখক : প্রাবন্ধিক,কলামিষ্ট ও শিক্ষাবিদ।



ফেইসবুকে আমরা