বাংলাদেশ, , বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২০

করোনা মহামারীর এই সময়ে মধ্যবিত্তদের সংকট উত্তরণে এগিয়ে আসতে হবে : সজল কান্তি চৌধুরী

  প্রকাশ : ২০২০-০৭-১৪ ১৬:৪০:৩৬  

পরিস্হিতি২৪ডটকম : বর্তমানে করোনাভাইরাসে আক্রান্তদের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলছে। এ সময়ে দেশ এক কঠিন দুর্যোগের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। শুধু বাংলাদেশ নয়, পুরো পৃথিবী এক অজানা শঙ্কায় ভর করে চলেছে। এই মহামারি কবে নাগাদ পৃথিবী থেকে বিদায় নেবে, সেটিও একরকম অনিশ্চিত। সব মিলিয়ে চরমভাবে স্থবির হয়ে পড়েছে মানুষের জীবনমান, ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক জীবনযাপন। স্থবির হয়ে আছে সংক্রমিত এলাকাগুলো। উপার্জনের পথ বন্ধ অধিকাংশ মানুষেরই। জমানো টাকা খরচ করে খাচ্ছেন পরিবারগুলো। প্রতিদিন অর্থ খরচ হচ্ছে কিন্তু উপার্জন নেই। ফলে যতদিন যাচ্ছে তাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ তত গভীর হচ্ছে! এলাকার মধ্যবিত্ত মানুষের দুর্ভোগ দিন দিন বেড়েই চলছে বলে পত্রিকান্তরে প্রকাশিত বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। করোনাভাইরাসের আতঙ্কের সঙ্গে আর্থিক ক্ষতির চিন্তায় রয়েছেন তাদের অধিকাংশ। সমাজে আর একটা শ্রেণি আছে, যারা মধ্যবিত্ত। তাদের আবার দুটো শ্রেণি আছে। নিম্ন মধ্যবিত্ত আর উচ্চ মধ্যবিত্ত। এরা সংখ্যায় কম নয়, বরং অধিক। সাধারণত জীবনভর যাঁতাকলে পিষ্ট হতে থাকা মানুষগুলোকে বলা হয়, মধ্যবিত্ত। সংসারের চাহিদা মেটাতে হিমশিম খেতে হয় তাদের। তাই এই করোনার ভয়াল থাবায় আরও জটিল হয়েছে তাদের চলমান পরিস্থিতি। মূলত হাঁটা-চলা কিংবা বেশভূষায়, বুকের ভেতরে থাকা চাপা কষ্ট-যন্ত্রণার ছাপ নেই। থেকে থাকলেও ঢাকা পড়ছে মাস্কের আড়ালে। যত সমস্যার মধ্যেই থাকুন না কেন, ‘কেমন আছেন’ প্রশ্ন করলে মধ্যবিত্তের প্রিয় উত্তর ‘ভালো আছি’। এই করোনাকালেও সবাই মুখে হাসি টেনে রাখলেও সবচেয়ে বিপজ্জনক সময় পার করছে মধ্যবিত্ত শ্রেণি। চাকরি-ব্যবসা থাকে কি থাকে-না এই অনিশ্চয়তার মধ্যে পুরো জীবনটাই যেন আতঙ্কের সাগরের হাবুডুব খাচ্ছে। কেননা সমাজের এ শ্রেণিটা অর্থাৎ মধ্যবিত্ত মানুষের প্রত্যাশা খুব বেশি নয়। শুধু সম্মানের সঙ্গে একটু খেয়ে-পরে বাঁচাটাই এদের জীবন। সমাজের এ পরিবারগুলো সাধারণ একটা শ্রেণির কাছে অনুসরণীয়। যাদের সম্মানের চোখেই দেখে সমাজ। কিন্তু বর্তমানের এ পরিস্থিতিতে চরম বিপাকে পড়েছে এ পরিবারগুলো। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক বলছে, বাংলাদেশে মধ্যবিত্তের সংখ্যা ৩৭ মিলিয়নের অধিক, যাদের প্রতিদিনের মাথাপিছু আয় ২ থেকে ২০ ইউএস ডলার। এরা সমাজ বিনির্মাণে এবং সমাজকে টিকিয়ে রাখতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। দেশের মানুষের মূল্যবোধ, শিক্ষা, চিকিৎসা, আইনকানুনসহ নানাবিধ বিষয়ে তাদের খেয়াল, অংশগ্রহণ ও ভূমিকা অনিবার্য এবং অনস্বীকার্য। তাদের সবচেয়ে বড় একটা সমস্যা হচ্ছে তাদের ‘আত্মসম্মানবোধ’। সম্মান তাদের কাছে বড়। তারা অন্যের দুঃখে কাঁদেন, অন্যের সঙ্গে ব্যথা ভাগ করে নেন, প্রয়োজনে দেশের জন্য রক্ত দেন। তারা অন্যের কাছে হাত পাততে চান না। নিজে না খেয়ে অন্যকে খাওয়াতে পছন্দ করেন, নিজের দুর্বলতা অন্যের কাছে প্রকাশ করতে চান না। তাই এই সমাজ দেখতে পায় না তাদের দুঃখের উপাখ্যান। যেহেতু তারা কষ্টের কথা বলতে ইচ্ছুক নন, নিজের বুকের মধ্যে রাখেন নিজের কষ্ট লুকিয়ে, তাই তারা বঞ্চিত থাকেন। সমাজ তাকে বঞ্চিত করে; রাষ্ট্র তার পাশে থাকে না। হয়তো রাষ্ট্র তাদের কষ্টকে অনুধাবনই করে না। অথচ তারা ভেঙে যান, সমস্যায় জর্জরিত হয়ে থাকেন, অভাবে কষ্ট পান। এই যেমন করোনার কারণে মানুষ এখন একপ্রকার ঘরবন্দি, কাজ নেই, আয় নেই। অনেকের হাতে যা পয়সা ছিল, তা শেষ হয়ে গেছে। যাদের হাতে কিছু নেই, তাদের খাবার কষ্ট শুরু হয়ে গেছে। পত্রিকায় দেখেছি অনেকে গরিব মানুষের পাশাপাশি সাহায্যের জন্য লাইনে দাঁড়িয়েছেন; কিন্তু তাদেরকে পোশাক-আশাকে যথেষ্ট গরিব নয় বলে সাহায্য দেওয়া হয়নি। ভদ্রলোকেরা মন খারাপ করে বেরিয়ে গেছেন নীরবে চোখের জল ফেলতে ফেলতে। এমন অনেক তথ্য আশেপাশে আছে আমাদের। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এদের ব্যাপারে বলেছেন, কিন্তু এরা অনেকেই জানেন না কীভাবে কোথায় তাদের যেতে হবে সাহায্যের জন্য। সাধারণত করোনার কারণে নিুআয়ের মানুষ যতটা বিপদে পড়েছে, তার চেয়ে বেশি বিপদে ও বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছে নিম্ন-মধ্যবিত্ত বা মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ। সরকারের করোনাকালীন নানা সহায়তা কর্মসূচির তালিকায় নিম্নআয়ের মানুষ নাম ওঠাতে পারলেও নিম্ন-মধ্যবিত্ত বা মধ্যবিত্ত শ্রেণি তা পারছে না। তারা না পারছে নিজেদের সামাজিক অবস্থান ধরে রাখতে, না পারছে কারো কাছে হাত পাততে। তাদের অনেকেরই এখন ভেতরে ভেতরে গুমরে মরার দশা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে, গত ১০ বছরে আমাদের দেশে প্রায় এক কোটি মানুষ হতদরিদ্র অবস্থা কাটিয়ে উঠতে সম হয়েছেন। সরকারি তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০১০ সালে দেশে হতদরিদ্র ব্যক্তির সংখ্যা ছিল ২ কোটি ৫৮ লাখ। ২০১৯ সালের জুন মাস শেষে অতি গরিব বা হতদরিদ্র ব্যক্তির সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ৬০ লাখের কিছুটা বেশি। বাংলাদেশে এখন প্রায় ১৮ কোটির কাছাকাছি জনসংখ্যা রয়েছে। সব মিলিয়ে দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে সোয়া তিন কোটি মানুষ। আমরা জানি, গত প্রায় এক দশক ধরে এশিয়ান অর্থনীতিগুলোর বড় চালিকা শক্তি এই মধ্যবিত্ত শ্রেণি। কেননা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে মধ্যবিত্তের হার ধীরে ধীরে বাড়ছে। মধ্যবিত্তের হার বাড়া মানে দারিদ্রের হার কমে আসা, যারা আগে দরিদ্র ছিলেন, তাদের মধ্য থেকে কিছু মানুষ এখন দারিদ্রের চক্র থেকে বের হয়ে নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণিতে যোগ দিচ্ছেন। বিবিএস’র জুন ২০১৯ সালের হিসেব মতে, জুন মাসের শেষে দেশের দারিদ্র্য হার সাড়ে ২০ শতাংশে নেমে এসেছে। ২০১৮ সালের জুন মাস শেষে এই হার ছিল ২১ দশমিক ৮ শতাংশ। গত জুন শেষে অতি দারিদ্রের হার নেমেছে সাড়ে ১০ শতাংশে। এক বছর আগে এর হার ছিল ১১ দশমিক ৩ শতাংশ। বর্তমান এই সঙ্কটে যদি নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষেরা আর্থিক সহায়তা না পান বা এই অবস্থা আরও লম্বা সময় ধরে দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে এই শ্রেণিটি আবার হতদরিদ্রদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যেতে পারেন, যা সমাজ ও অর্থনীতির জন্য আদৌ ভালো সংবাদ নয়। অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা এবারের করোনা পরিস্থিতির কারণে মধ্যবিত্তরা বড় রকমের সংকটে পড়েছে। এর পেছনে অবশ্য রয়েছে অনেকগুলো কারণ। বিভিন্ন সংকটের সময় উন্নত অনেক রাষ্ট্রে ক্ষতিগ্রস্ত মধ্যবিত্তদের জন্য নগদ সহায়তা দেওয়া হয়, এবারও হচ্ছে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে মধ্যবিত্তরা পিছিয়ে। অর্থনীতিবিদরা বলেন, আমরা আমাদের মধ্যবিত্তদের নিয়ে ভাবি না। তবে অনেক এলাকায় ব্যক্তি উদ্যোগে মধ্যবিত্তদের সহযোগিতা করা হচ্ছে। কিন্তু এসব মানুষের জন্য এখন আমাদের দেশে আরো ব্যাপকভাবে ভাবার সময় এসেছে। বিশেষ করে করোনাকালীন এমন কঠিন সময়ে মধ্যবিত্তদের দিতে হবে আর্থিক সহযোগিতা। এ ক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে একটি হেল্পলাইন বা হটলাইন খোলা যেতে পারে। যেখানে মধ্যবিত্তরা তাদের সমস্যার কথা বলবেন। এখানে নাম-পরিচয় গোপন রাখা হবে। কারণ মধ্যবিত্তদের সবচেয়ে বড় ভয় লোকলজ্জার। তারা লোকলজ্জার ভয়ে কারো কাছে সাহায্য চাইতে পারেন না। তাই নাম-ঠিকানা গোপন রাখা হলে তাদের মধ্যেও স্বস্তি কাজ করবে। মধ্যবিত্তরা সাহায্য পেয়ে করোনাকালীন কঠিন সময়কে কিছুটা হলেও ভালোভাবে দিন পার করতে পারবেন। মানসিকভাবেও থাকবে সুস্থ। আমাদের মনে রাখতে হবে, মধ্যবিত্তের জন্য বড় কষ্ট হচ্ছে সামাজিক মর্যাদাবোধের প্রশ্ন। এ ছাড়া মধ্যবিত্ত এখন আর তার সেই নির্দিষ্ট জীবনযাপন স্টাইল রক্ষা করতে পারছে না। এ আঘাত তার জন্য তীব্র। মধ্যবিত্তের জন্য তার সামাজিক ও অর্থনৈতিক দুদিকেই অভিঘাতটা অনেক বেশি। তাই এক্ষেত্রে ভাববার সময় এসেছে। আমরা নিশ্চয় জানি, পৃথিবীতে অনেক সফল ও ধনী ব্যক্তি রয়েছেন, যারা চরম দারিদ্র্যকে জয় করে সবার কাছে দৃষ্টান্ত ও অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিণত হয়েছেন। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্যের মনে রাখতে হবে, কোনো কিছুই সহজভাবে আসবে না এবং তাদের অনেক কঠিন সময়ের মুখোমুখি হতে হবে। কিন্তু কখনোই হাল ছেড়ে দেয়া যাবে না। যদি কেউ সততা, অধ্যবসায় ও পরিশ্রম করেন, তাহলে সবাইকে ছাড়িয়ে অবশ্যই তিনি সফল হবেন এবং সাফল্যের গল্প রচনা করবেন। আমাদের সমাজের অনেকেই আছেন এভাবে সফল হচ্ছেন এবং গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে দায়িত্ব পালন করছেন। তাই মূলত হাল ছেড়ে না দিয়ে মনোবল চাঙ্গা রেখে সুস্থ ঠাণ্ডা মস্তিষ্কে সংকট উত্তরণের পথ বেছে নিতে হবে। আর আমাদের রাষ্ট্রচালিত শক্তিতে যাঁরা আসীন, তাঁদের ভাবতে হবে এবং সময়োচিত পদক্ষেপ নিতে হবে এই মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর জন্য। না হয় এই অবস্থা চললে দুই মাসের মধ্যে অনেক মধ্যবিত্ত যোগ হবে নিম্নবিত্তের তালিকায়।

লেখক : কলামিস্ট, নাট্যজন, সাংস্কৃতিক কর্মী।



ফেইসবুকে আমরা