বাংলাদেশ, , মঙ্গলবার, ২১ মে ২০১৯

আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের অগ্রপথিক দার্শনিক ইবনে সিনা : ডাঃ মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন

  প্রকাশ : ২০১৯-০৫-০৯ ১৩:৪৭:২৩  

পরিস্হিতি২৪ডটকম : বিজ্ঞানের একটি অন্যতম শাখা হচ্ছে চিকিৎসাবিজ্ঞান। আর এই চিকিৎসাবিজ্ঞানে ইবনে সিনা সারা বিশ্বে সুনাম অর্জন করেছিলেন। তিনি ইতিহাসের অত্যন্ত গুণী ব্যক্তি। তার পুরো নাম আবু আলী হোসাইন ইবনে আবদুল্লাহ আল হাসান ইবনে আলী ইবনে সিনা। তাকে বলা হয় ইতিহাসের অন্যতম সেরা চিকিৎসাবিজ্ঞানী, গণিতজ্ঞ, জ্যোতির্বিজ্ঞানী এবং দার্শনিক। ইরান, তুরস্ক, আফগানিস্তান, রাশিয়াসহ অন্যান্য দেশের বিজ্ঞজনেরা এই মহৎপ্রাণ দার্শনিককে তাদের জাতীয় জ্ঞানবীর হিসেবে দাবি করে। গুণধর এই ব্যক্তিটি সাধারণত ইবনে সিনা, বু-আলী সিনা এবং আবু আলী সিনা নামেই অধিক পরিচিত। ৯৮০ খ্রিস্টাব্দে তুর্কীস্তানের বিখ্যাত শহর বুখারার নিকটবর্তী আফসানা গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। পিতার নাম আবদুল্লাহ এবং মাতার নাম সিতারা বিবি। পিতা আবদুল্লাহ খোরাসানের শাসনকর্তা ছিলেন।

জন্মের কিছুকাল পরেই তিনি ইবনে সিনাকে লেখপড়ার সুব্যবস্থা করার জন্য বুখারায় নিয়ে আসেন। অসামান্য মেধার অধিকারী এই বালক মাত্র দশ বছর বয়সে পবিত্র কুরআন হেফয শেষ করেন। ইবনে সিনার তিনজন গৃহশিক ছিলেন। তাদের মধ্যে ইসমাইল সুফি তাকে শিক্ষা দিতেন ধর্মতত্ত্ব, ফিকাহশাস্ত্র আর তাফসির। মাহমুদ মসসাহ শিক্ষা দিতেন গণিতশাস্ত্র এবং বিখ্যাত দার্শনিক আল না তেলি শিক্ষা দিতেন দর্শন, ন্যায়শাস্ত্র, জ্যামিতি, টলেমির আল মাজেস্ট, জাওয়াহির মানতিক প্রভৃতি। মাত্র ১৭ বছর বয়সে প্রভূত জ্ঞান তিনি লাভ করে ফেলেন। বিখ্যাত এই দার্শনিকের কাছে এমন কোনো জ্ঞান আর অবশিষ্ট ছিল না, যা তিনি ইবনে সিনাকে শিক্ষা দিতে পারবেন। এরপর ইবনে সিনা নিজেই এবার নিজের শিক্ষক বনে যান। এ সময় চিকিৎসাশাস্ত্র সম্বন্ধে তার মৌলিক জ্ঞানের বিকাশ ঘটে। এরিস্টটলের দর্শন সম্পূর্ণ ধাতস্থ করেন এ সময়েই। নতুন বই না পেয়ে আগের বইগুলোই আবার পড়তে লাগলেন। তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়তে লাগল। বিভিন্ন দেশ থেকে শিক্ষার্থীরা তার কাছে পড়তে আসত, তরুণ বয়সেই তিনি এবার শিক্ষকতা শুরু করেন। এবার তিনি চিকিৎসাবিদ্যা সম্পর্কিত কিতাব সংগ্রহ করে গবেষণা করতে শুরু করেন। ইবনে সিনা তার আত্মজীবনীতে লিখেছেন যে, এমন বহু দিনরাত অতিবাহিত হয়েছে যার মধ্যে তিনি ক্ষণিকের জন্যও ঘুমাননি। কেবল জ্ঞান সাধনার মধ্যেই ছিল তার মনোনিবেশ। জীবনের বেশির ভাগ সময়ই তিনি গবেষণা করতেন। কান্তিতে যখন ঘুমিয়ে পড়তেন তখন অমীমাংসিত প্রশ্নগুলো স্বপ্নের ন্যায় তার মনের মধ্যে চলে আসত। জ্ঞানের দরজা যেন খুলে যেত। হঠাৎ ঘুম থেকে উঠেই সমস্যাগুলোর সমাধান পেয়ে যেতেন। সে সময় বোখারার বাদশাহ নুহ বিন মনসুর এক দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হন। সব চিকিৎসক এই চিকিৎসায় ব্যর্থ হয়। ততদিনে সিনার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে সব জায়গায়। ইবনে সিনা স্বীয় চিকিৎসাবিদ্যা দিয়ে বাদশাহকে সম্পূর্ণ সারিয়ে তুলেন। এর পরেই তার খ্যাতি এ সময় দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে পড়ে। আরোগ্য লাভের পর বাদশাহ ইবনে সিনাকে পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা করেন। এ সময় সিনা চাইলে বিপুল সম্পদ ও উচ্চপদ লাভ করতে পারতেন। কিন্তু ইবনে সিনা কেবল বাদশাহর দরবারের গ্রন্থাগারে প্রবেশ করে পড়াশোনার অনুমতি প্রার্থনা করেন। বাদশাহ তার এ প্রার্থনা মঞ্জুর করেন। কৃতজ্ঞতা স্বরূপ বাদশাহ রাজদরবারের কুতুবখানা খুলে দেন। অসীম ধৈর্য্য সহকারে অল্প কিছুদিনেই তিনি সমস্ত বই মুখস্ত করে ফেলেন। ১৯ বছর বয়সে বিজ্ঞান, দর্শন, ইতিহাস, ন্যায়শাস্ত্র, চিকিৎসাশাস্ত্র, কাব্য-সাহিত্য প্রভৃতি বিষয়ে জ্ঞান লাভ করেন। ২১ বছর বয়সে মাজমুয়া নামক একটি বিশ্বকোষ রচনা করেন। ইবনে সিনার সুখ্যাতি চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়লে গজনীর সুলতান মাহমুদ তাকে পেতে চাইলেন। কিন্তু ইবনে সিনা ছিলেন আত্মমর্যাদাবোধ সম্পন্ন স্বাধীন ব্যক্তি। সুলতান মাহমুদের কাছে গেলে তার স্বাধীন জ্ঞান গবেষণার ক্ষতি হবে ভেবে তিনি তখনি আত্মগোপন করেন। ইবনে সিনা অনেক দেশ ভ্রমণ করেছিলেন। তার অভিজ্ঞতার ঝুলিও ছিল সমৃদ্ধ। তৎকালীন মুসলিম বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ নগরী খোয়ারিজমে গিয়েছিলেন। সেখানে তার সঙ্গে পণ্ডিত আল বেরুনির সাাৎ হয়। আল বেরুনির উৎসাহ ছিল ভারতবর্ষ নিয়ে। কিন্তু ইবনে সিনা কখনো ভারত অভিমুখে আসেননি। তিনি যাত্রা করেছিলেন ভারতবর্ষের উল্টো দিকে অর্থাৎ পশ্চিম দিকে। তার মূল উৎসাহও ছিল পশ্চিমের দিকে। এদিকে ইতিহাস থেকে জানা যায়, ইবনে সিনার চিকিৎসাবিজ্ঞান সংক্রান্ত বইগুলো প্রাচ্যের সীমানা ছাড়িয়ে পাশ্চাত্য জগতে স্থায়ী অবস্থান তৈরি করে নিয়েছিল। পরবর্তীতে তিনি রাও প্রদেশে এবং ইস্পাহানে আশ্রয় নেন। তিনি আল-কানুন ও আশ-শেফা নামক দুটি গ্রন্থ রচনা করেন। আল-কানুন কিতাবটিতে শতাধিক রোগের কারণ লক্ষণ ও প্রতিকার এর বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেয়া আছে। আশ-শেফা দর্শন শাস্ত্রের একটি বিখ্যাত গ্রন্থ যা ২০ খণ্ডে বিভক্ত। ইবনে সিনা পদার্থবিজ্ঞান, দর্শন, ধর্মতত্ত্ব, জ্যামিতি, গণিত, চিকিৎসাবিজ্ঞান, সাহিত্য প্রভৃতি বিষয়ে প্রায় শতাধিক কিতাব রচনা করেন। এগুলোর মধ্যে আল কানুন, আশ শেফা, আরযুযা ফিত-থিব, লিসানুল আরব, আল মজনু, আল মুবাদাউন মায়াদা, আল মুখতাসারুল আওসাত, আল আরসাদুল কলিয়া উল্লেখযোগ্য। এসবের মধ্যে আল কানুন কিতাবটি চিকিৎসাবিজ্ঞানে এক বিপ্লব ঘটিয়েছিল। এই গ্রন্থ চিকিৎসাশাস্ত্রের মূল অপতিদ্বন্দ্বী পাঠ্যপুস্তক হিসেবে গণ্য ছিল প্রায় পাঁচ শতক ধরে। আল কানুন কিতাবটি ল্যাটিন, ইংরেজি, হিব্রু প্রভৃতি ভাষায় অনূদিত হয় এবং তৎকালীন ইউরোপের চিকিৎসা বিদ্যালয়গুলোতে পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। আল কানুন পাঁচটি বিশাল খণ্ডে বিভক্ত, যার পৃষ্ঠা সংখ্যা ৪ লক্ষাধিক। কিতাবটিতে শতাধিক জটিল রোগের কারণ, লক্ষণ, পথ্যাদির বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়। ইবনে সিনা ফার্মাকোলজি ও ক্লিনিক্যাল প্র্যাকটিসের উন্নয়ন করেন। তবে তার মূল অবদান ছিল চিকিৎসাশাস্ত্রে। তিনি হলিস্টিক মেডিসিনের প্রণেতা। যেখানে একই সঙ্গে শারীরিক, মানসিক এবং আত্মিক যোগসূত্রকে বিবেচনায় রেখে চিকিৎসা দেওয়া হয়। তিনি মানুষের চোখের সঠিক এনাটমি বর্ণনা করেন। তিনি বলে যান যক্ষ্মা একটি ছোঁয়াচে রোগ। যা আরও পরে সঠিক বলে প্রমাণিত হয়। মেনিনজাইটিস রোগটি তিনি আবিষ্কার করেন। অদম্য নির্ভীক এই জ্ঞান সাধক মনে করতেন—‘আল্লাহর ভয় মানুষকে সকল ভয় থেকে মুক্ত দেয়।’ রাজপরিবারে জন্ম নেয়া ইবনে সিনা ধন সম্পদ, রাজসম্মান সবকিছু বাদ দিয়ে জ্ঞান সাধনা ও কঠোর অধ্যবসায়কে জীবনের ব্রত করে নিয়েছিলেন। জীবনের শেষ প্রান্তে খোরাসান শহর থেকে ইরানে যাওয়ার পথে ইবনে সিনা তার সমসাময়িক কবি ফেরদৌসীর জন্মস্থান বিখ্যাত তুস নগরী পরিদর্শন করেন। এখান থেকে তিনি ইরানের সুপ্রাচীন শহর হামাদানে গমন করেন। ঐশ্বর্যশালী এবং ঐতিহাসিক নগরী ছিল শহর হামাদান। তাই ভালো লেগে গিয়েছিল ইবনে সিনার। তিনি এই শহরে অনেকদিন ছিলেন। দেশ-বিদেশ ভ্রমণ করে তিনি কান্ত হয়ে পড়েছিলেন। এদিকে তার বয়সও হয়েছিল অনেক। তাই তিনি মানসিক ও শারীরিক প্রশান্তি খুঁজছিলেন। আর এই হামাদান শহরই ছিল তার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত। তিনি এই শহরেই প্রশান্তি খুঁজে পান। এখানে তিনি ধীর-স্থির মনে চিন্তা করার সময় সুযোগ পান। হামাদানের সম্রাটও ইবনে সিনাকে সমাদরে গ্রহণ করেছিলেন। তার থাকা-খাওয়া ও নিরাপদ চলাচলের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। তিনি তখন চিকিৎসাসেবার মাধ্যমে স্বাধীন জীবিকা উপার্জন করতেন। হামদানের সঙ্গে সিনার অনেক স্মৃতি জড়িত ছিল। এই হামদান নগরীতে তিনি জীবনের শেষ সময়টুকু পর্যন্ত অবস্থান করেন। হামদান যুদ্ধ শিবিরে অবস্থানকালে তার এক ভৃত্য ঔষধের সাথে আফিম মিশিয়ে দিলে এরই বিষক্রিয়ায় ১০৩৭ সালে চিকিৎসা বিজ্ঞানের এই অগ্রপথিক দুনিয়া ত্যাগ করেন।

লেখক: চিকিৎসক, কলামিষ্ট, প্রাবন্ধিক ও সভাপতি, বৃহত্তর চট্টগ্রাম ডেন্টাল এসোসিয়েশন।



ফেইসবুকে আমরা